মৌলনা মুফতী দবীর হোসেন সাহেবঃ এক নক্ষত্র পতন

মহিউদ্দীন আহমেদ : মৌলনা মুফতী দবীর হোসেন সাহেব। বীরভূম তো বটেই সারা রাজ্যের মধ্যে স্বনাম – উদ্যোগ কর্মগুণে পরিচিত একটি নাম। শুধু একটি নামই নয় – মানুষটি নিজেই একটি সংগঠন – একজন প্রতিষ্ঠান। ইসলামিক জ্ঞান অর্জন, শিক্ষাদান, ইসলামিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে সমাজের মানুষ কে প্রকৃত সৎ – নিষ্ঠাবান – বিবেকবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করে গেছেন জীবনভর।

    লালমাটির বীরভূমে, গ্রামের কাঁদা মাটি মেখে বড় হওয়া দবীর হোসেন বড় হয়েছেন গ্রামেই। পাঁড়ুই থেকে সবুজ ধান ক্ষেত চিঁড়ে সোজা পশ্চিমে বাতিকার পেড়িয়ে ইক্ষুসাড়া, প্রত্যন্ত একটা গ্রাম। সেই গ্রামে বিশাল জায়গা জুড়ে তার রক্ত – ঘামের মধ্য দিয়ে হাতে গড়া একটা প্রতিষ্ঠান — ইক্ষুসাড়া জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া। যা প্রতিষ্ঠা করেন নিজ হাতে। তারপর তিলে তিলে হাজার মানুষের সাহায্যে – ভালোবাসায় – ভক্তিতে- শ্রদ্ধায় তার প্রতিষ্ঠান আজ বীরভূম ছাড়িয়ে সারা রাজ্যে ইসলামিক মহলে পরিচিত প্রাপ্ত হয়েছে। সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশ পুকুর সহ বেশ সাজানো গোছানো তার হাতের তৈরী এই মাদ্রাসা। যেখানে হাজার হাজার আলেম মৌলনা মুফতী তৈরী হয়েছে তাঁর হাত দিয়ে। ইসলামিক কালচার, কৃষ্টি, কোরআন হাদিসে তার দক্ষতা, যোগ্যতা অপরিসীম। তাঁর হাতে- তাঁর স্নেহে – তাঁর মায়া মমতায় – তাঁর শাষনে – তাঁর নেক নজড়ে রাজ্য ছাড়িয়ে দেশের হাজার হাজার আলেম – মৌলনা – মুফতী প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নিজ এলাকার ছেলেরা, জেলা বা রাজ্যের ছেলেরা যাতে এই মাদ্রাসা থেকে মৌলনা যোগ্যতা অর্জন করতে পারে, বাইরে যাতে যেতে না হয় তার জন্য মাদ্রাসার এ্যাকাডেমিক স্তরকেও উন্নীত করেছেন রাজ্যের ছেলেদের স্বার্থেই। বৃষ্টি ভেজা সকালকে স্বাক্ষী রেখে, লাখ মানুষকে কাঁদিয়ে ২৫ শে জুলাই, জুম্মাবারের সকাল ৬. ১০ মিনিটে ৮৭ বছর বয়সে, শারীরিক অসুস্থ্যতা জনিত কারনে তিনি পারি দেন পরপারে ( ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহী রাজেউন)।

    জুম্মাবারের সকালেই তার মৃত্যুর খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি গ্রামে মসজিদের মাইকে জানানো হয় সেই বেদনাভরা বিদায় সংবাদ। জুম্মার নামাজেও মসজিদে মসজিদে তাঁর জন্য হয় বিশেষ দোয়া, দিনের শেষ বেলায় মেঘলা আকাশময় শ্রাবনের গোধূলি লগ্নে এই মহান মানুষটিকে, শেষ শয্যায় সাজিয়ে তাঁর হাতে গড়া জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া প্রতিষ্ঠানের সামনে হাজার হাজার মানুষের স্ব-উদ্যোগ উপস্থিতিতে নামাজে জানাজার মাধ্যমে শেষ বিদায় জানানো হয়। এই মুফতী – মৌলনা – আলহ্বাজ – জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি দবীর হোসেন সাহেবের বিদায়, শেষ বিদায় নয়। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনও লাখো মানুষের হৃদয় – মন – মননে। তাঁর আত্মীয় – আত্মজন হিসেবহীন।
    এই মহান মানষিকতার মানুষটি তরুন অবস্থায় গায়ে গতরে খেঁটে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রক্তকে পানি করে নিজ উদ্যোগে তাঁর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। নিজ পরিবার – সন্তানদের কথা না ভেবে নিজের বাড়ী ঘড় সম্পদ সর্বস্ব ত্যাগ করে সমাজের উন্নতির জন্য, তাঁর মাদ্রাসার জন্য নিজের জীবনের সুখ আহ্বালাদ সব কিছুই তিনি বির্সজন দিয়েছেন। জীবনভর ছিলের বিনয়ী – নম্র – ভদ্র। নিজ মাদ্রাসা ছাড়াও রাজ্যের একাধিক মাদ্রাসার অভিভাবক – পৃষ্ঠপোষক – উপদেষ্ঠা ছিলেন। ছিলেন এক সামাজিক অভিভাবক। তাঁকে বলা হতো “স্বর্ণ মুকুট”। তাঁকে শ্রদ্ধা সম্মান করতো না এমন লোক নেই এই সমাজে। তিনি ছিলেন আমাদের প্রেরণা। তাঁর জীবন এমনই যে তাঁর থেকে শিক্ষা নেবে এ সমাজ। তিনি জীবনে হাজার বই পড়েছেন, পড়িয়েছেন। আজ তাঁর জীবনটাই একটা বই, একটা সাবজেক্ট। তাঁকে অনুকরন করে, অনুস্মরণ করে যে কোনো মানুষ নিজের জীবন বদলাতে পারবেন, অনেক কিছুই শিক্ষা নিতে পারবেন। যে শিক্ষা অন্য কোনো বইয়ে নেই। আজ তাঁর মৃত্যু স্বার্থক। তাঁর জীবনের শেষ বিদায়বেলায়, এত মানুষের উপস্থিতি ছিলো যা থেকে এটা বোঝা যায় তিনি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন, অথচ জীবিত অবস্থায় যা বোঝা যায় নি, যা তিনি বুঝতে দেন নি। তিনি জলসা মেহফিলে দিয়েছেন বক্তৃতা, সমাজ ও মানুষের জীবনের পরিবর্তনের জন্য কাজ করে গেছেন জীবনভর। মসজিদ – মাদ্রাসার কোন সমস্যা হলের তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে ছুটে গেছেন অনেক মানুষই। মানুষের ব্যাক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার শরীয়তসম্মত ভাবে ন্যায় – নিরপেক্ষ ভাবনায় করেছেন সমাধান। আমার মতো হাজারো মানুষের সঙ্গেই ছিলো তার সখ্যতা- সহমর্মিতা।

    শুধু যে তিনি মুসলিম সমাজের উন্নয়ন- মুসলিম সমাজের মানুষের সঙ্গে ভালো ভাব বিনিময়, ভালোবাসার সম্পর্ক বজায় রাখার পরামর্শ দিকে তাই নয়। মুসলিম ছাড়াও হিন্দু সমাজের মানুষের সঙ্গেও ছিলো তার সখ্যতা ভালোবাসাময় সম্পর্ক। তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রতীর এক মেরুদণ্ড। সবার কাছে ছিলন সবাকার হয়ে। তাকে নিয়ে বলতে গেলে অনেক গল্প-কথা-কাহিনী বলতে হয়, যা দুচারকথায় বলা সম্ভবপর নয়। আমার এই স্মৃতিচারনা একশো পাতার গ্রন্থে কয়েক শব্দ মাত্র।

    ইক্ষুসাড়া জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া – প্রতিষ্ঠনে শুক্রবারের ভোরে ফজরের আজান হয়েছে – তখনও ঘোষনা হয় নি যে তিনি আর নেই। তিনি আজও নেই। অথচ তাঁর মাদ্রাসা ছাত্র শিক্ষক বিশাল পরিসর সবই আছে। জুম্মার নামাজ – আসরের আজান – নামাজের পর আবার তাঁর জন্য অনুষ্ঠিত হলো জানাজা নামাজ। যে জানাজায় লাখো মানুষের ভীড়ে – দোয়ার মধ্যে দিয়ে তিনি হাঁসতে হাঁসতে গেলেন আল্লাহর কাছে হাঁসি মুখে, আর যার স্বাক্ষী থাকলো – ইক্ষুসাড়া জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া। স্বাক্ষী থাকলো বৃষ্টি ভেজা বিকেল আর লাখো মানুষের দু হাত তোলা মোনাজাত।

    নতুন গতি

    News Publication