নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির দাবি দিবস পলন এবং দশম ত্রিবার্ষিক সম্মেলন

জাকির হোসেন মোল্লা : লক্ষীকান্তপুর, মন্দির বাজার থানার বিদ্যাধরপুর নবকুমার বিদ্যামন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হলো নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির দশম ত্রিবার্ষিক সম্মেলন এবং ৩০শে আগস্ট “দাবি দিবস” পালনের কর্মসূচি। এদিনে উপস্থিত ছিলেন নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদক গৌতম ব্যানার্জি এবং নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির সম্পাদক অনুপ কুমার নস্কর। তারা বলেন, রাজ্যের ক্ষমতা তৃণমূল কংগ্রেসের হাতেই রয়েছে, ২০১৬ সালের পরেও ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার তৈরি করে এখন প্রধান বিরোধীদল বিজেপি, বিজেপি আরএসএস কে এই রাজ্যে দাঁড়াবার মতো পরিবেশ করে দিচ্ছে তৃণমূল।
এই দুই শক্তি এক দিকে তৃণমূল সমস্ত বিরোধী পরিসরকে গলা টিপে খুন করে রাজ্যের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। অপরদিকে বিজেপি সম্প্রদায়িকতা ও জাতপাতের রাজনীতির মাধ্যমে মানুষকে বিভেদ সৃষ্টি করছে। পঞ্চায়েত পৌরসভা স্কুল কলেজ বোর্ড নির্বাচন সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে রাজ্য সরকার প্রহসনে পরিণত করেছে। ভোট লুট, খুন, জখম, ধর্ষণ জরিমানা আদায় সব কিছু অবাধে চলছে, সরকার এবং শাসকদল বিরোধী যে কোন প্রতিবাদ প্রতিরোধকে কখনো প্রশাসন কখনো তৃণমূলী জল্লাদ বাহিনীর দ্বারা বন্ধ করেছে। বর্তমান রাজ্যে কোন শিল্প গড়ে উঠছে না। তার বদলে তোলাবাজি একমাত্র শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। একগুচ্ছ তৃণমূল সংসদকে মানুষ দেখল তোয়ালে মুড়ে টাকা নিতে অথচ বিজেপির এথিক্স কমিটি কোন ব্যবস্থা নিল না। এতেই তৃণমূল বিজেপির যোগ সাজানো প্রমাণিত। রাজ্যের এখন প্রধান সমস্যা কর্মসংস্থান স্বাস্থ্য শিক্ষা ও শাসকদলের দুর্নীতি। রাজ্যের একাধিক শাসন শাসক দলের নেতা মানুষের টাকা নিয়ে নয় ছয় করছে এই টাকার উৎস মূলত শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি গরু পাচার কাঠ মানি প্রভৃতি উৎসেশ্রীর মাধ্যমে গ্রামের স্কুল গুলো থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকা বদলি হয়ে স্কুল গুলির পঠন-পাঠন ব্যাহত হলেও দুর্নীতির গেরোই নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না। স্কুল কলেজে যেমন শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না নতুন কারখানা না গড়ে ওঠায় কর্মসংস্থান নেই । নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে চলেছে বেকারত্ব । একমাত্র সরকার অনুকম্পায় বিভিন্ন ভাতায় এখন ভরসা। তাই লক্ষ্মীর ভান্ডার ও বিভিন্ন শ্রী নামে বিশ্রী আত্মসম্মান হানিকর প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। ভোটের স্বার্থে ক্লাবগুলোকে ৬০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে । সরকার এই সমস্ত খাতে খয়রাতের জন্য টাকা বরাদ্দ করে অথচ শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষা কর্মী ও অন্যান্য কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার ডিএ অর্থ বরাদ্দ করতে পারেনা। স্বৈরাচারী ও দুর্নীতি পরায়ণ সরকারের বিরুদ্ধে তাই আমাদের সংঘবদ্ধ হতে হবে। শিক্ষা ও আমাদের পেশা বাঁচানোর কর্মচারী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

এ দিনে কেন্দ্রীয় সরকারকে তুলে বলেন, দেশজুড়ে চলছে চরম মেরুকরণের রাজনীতি।একদিকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ অন্যদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ। চতুর্দশ লোকসভা নির্বাচনে আরএসএস নিয়ন্ত্রিত চরম দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিস্ট সুলভ মানসিকতায় সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি দেশের শাসন ক্ষমতায় এসে দেশকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে দেশের বাজারকে উন্মুক্ত করে লগ্নিপুজীর ধারক বাহক কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষায় ক্ষেত্রে পরিণত করেছে । দেশের প্রায় সত্তর শতাংশ কৃষির উপর নির্ভরশীল মানুষের উপর নেমে এসেছে বিরাট সংকট একদিকে বীজ সার বিদ্যুৎ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আর অন্যদিকে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় , এক সংকট তীব্রত হয়েছে এই প্রশ্নের গঠিত স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কেন্দ্রীয় সরকার কার্যকর করছে না। উপরন্ত তিনটি কৃষি বিলের মাধ্যমে কৃষক শোষণের পথ সুগম করা হয়েছে। ৫০০টির বেশি কৃষক সংগঠন লাগাতার অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে সরকারকে সেই বিল বাতিল করতে বাধ্য করেছে। সঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলনকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় নিয়ে যেতে পারলে রাষ্ট্রশক্তিকে পরাস্ত করা যায়, লড়াইয়ের এই নতুন দিগন্ত আগামী দিনে নিশ্চিতভাবে সংগ্রামী মানুষকে নতুন শক্তি যোগাবে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ও জীবন দায়ী ওষুধের মূল্য বেড়েই চলেছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। হ্রাস পেয়েছে কর্মসংস্থান। ঠিকা প্রথাই চুক্তিভিত্তিক কাজ যেখানে ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা কাজের সময় কোন কিছুই নেই এই বিবরণের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।নয়া শ্রম আইন এই কারণে পাশ করা হয়েছে। দেশের মেরুদন্ড রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংক বীমা রেলকে ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণের লক্ষ্যে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রায়ত্তের সংস্থাগুলিকে বন্ধ করে তা বিক্রি করে দেওয়ার নীতি গৃহীত হয়েছে। বিগত ৪৫ বছরের মধ্যে দেশে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ। নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ লাগু হয়েছে এর মাধ্যমে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার যাবতীয় বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন গঠিত হচ্ছে এবং আমাদেরকে এই আন্দোলন তীব্র রূপে গড়ে তুলতে হবে।

এছাড়া এদিনে উপস্থিত ছিলেন ব্লক সভাপতি দিবাকর, জেলা সদস্য অনিমেষ, দাঁতপুর সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষক জাকির হোসেন এবং মুফতি রুস্তম আলী পিয়াদা, এ বি টি এর কুলপি ২ ব্লকের দায়িত্বে তপন, কমরেড দিবাকর, শ্রী দীপঙ্কর, জেলা সদস্য জয়ন্তী ধর, শ্রীমতী মায়া রানী হালদার, শ্রী অশোক পাত্র, শ্রী সতীন্দ্রনাথ, শ্রী জগদীশ হালদার, শ্রী বিপ্লব, শ্রী বিশ্বজিৎ নস্কর সহ নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির সদস্যবৃন্দরাও উপস্থিত ছিলেন। এই দিনে নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে ১৬ দফা দাবি পেশ করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য ও দুর্নীতি মুক্ত করতে হবে । শিক্ষায় গৌরীকরণ ও বেসরকারিকরণ করা চলবে না। সাধারণের শিক্ষা বিরোধী শিক্ষা নীতি ২০২০ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অবিলম্বে সমস্ত বকেয়া মহার্ঘ ভাতা দিতে হবে। নয়া পেনশন স্কিম চালু করা চলবে না। সকল শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষা কর্মীদের ডাবলু বি এইচ এস ২০০৮ এর আওতায় আনতে হবে। সমকাজের সমবেতন দিতে হবে। মিড ডে মিলের বরাদ্দ ও রাধুনীদের বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বাজেট ১০% এবং জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ এবং রাজ্য বাজেটের ১০ শতাংশ বরাদ্দ করতে হবে । অবিলম্বে সিলেবাস পাঠ্যপুস্তং সংশোধন করতে হবে। স্বচ্ছ ভাবে বিদ্যালয় শিক্ষক শিক্ষিকা কর্মচারী নিয়োগ করতে হবে। স্নাতক স্তরের শিক্ষক শিক্ষিকা ও গ্রান্তকারীদের বেতন বৈষম্য দূর করতে হবে শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষা কর্মী সবার জন্য সি এ এস চালু করতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয় কম্পিউটার ডাটা অপারেটর অবিলম্বে নিয়োগ করতে হবে। বিদ্যালয়গুলির নন একাডেমিক কাজ বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে মধ্যশিক্ষা পর্ষদে নির্বাচন করতে হবে।