প্রাচীনকাল থেকে হিন্দুস্তানের হজ যাত্রার ইতিহাস

সেখ মনোয়ার হোসেন,বর্ধমান : ১৫জুন,২০২৪। 

    হজ আরবি শব্দ যার অর্থ যাত্রায় যোগদান করা বা কাবা তীর্থ যাত্রা। যা মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য একটি বিধান।ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে হিন্দুস্তান /ভারতবর্ষ থেকে ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে কেরলের চেরামন জামে মসজিদের শিলালিপি থেকে জানতে পারা যায় যে নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর জীবদ্দশায় রাজা চেরা মন পেরুমল মহানবী ও কাবা দর্শনের উদ্দেশ্যে গমন করেছিলেন, এবং নবীর হাতে বায়াত হয়ে তাজউদ্দিন নাম গ্রহণ করেছিলেন। অনুমান এরপর থেকেই বিক্ষিপ্তভাবে হজযাত্রা চলতো নীরবে।

    ৬৬৮ থেকে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে আরবের মুসলিমদের আগমন ঘটে এবং বণিকদের হাত ধরে হজযাত্রা অনুষ্ঠিত হতো সমুদ্রপথে।

    ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারত অভিযান করছিলেন, এবং মুসলিমদের সিন্ধু বিজয়ের কাল থেকেই ভারতে হজযাত্রা নিরবিচ্ছিন্নভাবে শুরু হয়। এই সিলসিলা চলে আসছিল মুঘল যুগের শুরু পর্যন্ত।

    ভারতবর্ষে দীর্ঘ ইতিহাসে মুসলিম শাসকরা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় হজ যাত্রার সু বন্দোবস্তা করতেন। যা মুঘল আমলে ইতিহাস থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে জানা যায়।

    মোগল ইতিহাস থেকে জানা যায় যে মুঘল আমলে হজে যাবার দুটি রাস্তা ছিল একটি স্থলপথে উত্তর-পশ্চিম ভারত অতিক্রম করে আফগানিস্তান -ইরান -ইরাক হয়ে সৌদি আরব, এটি ছিল খুবই কষ্টদায়ক ও বিপদ সংকলন পথ কারণ পথে জংলি পশু ও দুষ্কৃতি আক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকতো। দ্বিতীয় পথ ছিল লোহিত সাগর হয়ে জলপথে আরবে হজ করতে যাওয়া। যদিও পর্তুরগিজ দস্যদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ভয় ছিল।

    ১৬ শতকে লোহিত সাগর ছিল পতুর্গিজ নিয়ন্ত্রণে, তাদের কাছে কার্টাজেস/ কার্তাজ (নৌ লাইসেন্স) সংগ্রহ করে হজ যাত্রীদের হজ করতে যেতে হতো। এই সুযোগ নিয়ে তারা বিভিন্নভাবে হজ যাত্রীদের লুণ্ঠন করত।

    ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধে জয়লাভ করে বাবর হজ যাত্রার সুবন্দোবস্ত করার চেষ্টা করেন কিন্তু কিছুটা সফল হলেও সম্পূর্ণ সফল হতে পারেননি।

    মোগল সম্রাট আলেম, ওলামা ,মুফতী ও ফতোয়া বিভাগের মাধ্যমে আলোচনা করে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে “এ পর্যায়ে হজের বাধ্যবাধকতা নাই” ।

    বেশিদিন অবশ্য এই অবস্থা চলে নি, মুঘল সম্রাট বাবর স্থিতিশীল হয়ে কয়েকটি জাহাজ মিলিয়ে একটি নৌবহর তৈরি করে হজযাত্রীদের যাত্রা ও খাবার বন্দোবস্ত ও নিরাপত্তার সুবন্দোবস্ত করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হজ যাত্রা সুনিশ্চিত করেছিলেন। অটোমান খলিফারা ও সিরিয়া ও মিশর থেকে ভারতীয় হজ যাত্রীদের পথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। খলিফাদের বলা হত “পবিত্র ভূমি তত্ত্বাবধায়ককারী”।

    ভারত থেকে তৎকালে গুজরাটের সুরাট বন্দর থেকে হজ যাত্রা করা হতো। সুরাটকে বলা হত – ” বাব — মক্কা ” বা “বন্দর- ঈ- মোবারক” অর্থাৎ পবিত্র মক্কার তোরণ ।

    সম্রাট আকবর ই ছিলেন প্রথম মুঘল শাসক যিনি সরকারি খরচে এবং ভর্তুকি দিয়ে হজ যাত্রায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হজ ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি তিনি মক্কায় স্থায়ী একটি হিন্দুস্থানের হজ সেবা কেন্দ্র নির্মাণ করিয়েছিলেন।

    ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে পতুর্গিজদের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে সম্রাট আকবর প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হজ নৌবহর পাঠানো ঘোষণা দান করেছিলেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ মুঘল সভাসদ কে” মীর হাজি “(হাজীদের দলনেতা – আমির )নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি আর কেউ নন প্রচন্ড প্রভাবশালী আব্দুল রহিম খানে খানন মহাশয় কে। রহিমি , করিমি, ও সালার নামে তাঁর তিনটি জাহাজ ছিল। তখন কার একজন পরিব্রাজক জন ফ্রেয়ার কিয়ানি ওরফে হাজী মোহাম্মদ আমিন লিখেছেন যে জাহাজগুলোর ওজন ছিল ১৪০০ থেকে ১৬০০ টন এবং যাত্রী পরিবহন করতে পারত ১৭০০ জন হজযাত্রী।

    সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সাজাহানের আমলেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। শাহজাহানের সময় নতুন একজন মীর হাজী নিযুক্ত হয়েছিলেন।

    ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে রহিমি নামক একটি জাহাজ যার মালিক ছিলেন মরিয়ম উজ জামানি ওরফে যোধা বাই (সম্রাট জাহাঙ্গীরের মাতা) হজ যাত্রার সময় পতুর্গিজ দের কার্তাজ নেওয়া সত্বেও পতুর্গিজ বাহিনীর হাতে জাহাজ আক্রান্ত হয়। ইউরোপের লোকজন জানত যে রোহিনি নামক তৎকাল যুগে বিশ্বের সবথেকে বড় জাহাজ ও হিন্দুস্তানের সম্রাট জাহাঙ্গীরের মাতা হজে যাচ্ছেন প্রচুর ধনসম্পদ ,দৌলত, দানের উদ্দেশ্যে তাই বিভিন্ন অসিলায় লুটেরারা লুটপাট চালায়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের মাতার জাহাজ আক্রান্ত হওয়ায় সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মসম্মানে লাগে, তাই তিনি শত্রুর শত্রু এই তত্ত্বে ব্রিটিশদের সাথে যুগ্মভাবে পতুর্গিজ বাহিনীকে শায়েস্তা ও ধুলিস্যাৎ করে উপযুক্ত শিক্ষা দান করেন।

    সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময় দুটি নৌবহর সরকারিভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হজে পাড়ি দিত এবং হজ সম্পূর্ণ বিনা খরচে অর্থাৎ রাষ্ট্র খরচ বহন করত । এমনকি সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কন্যা জেবুন্নেশা ও হজ যাত্রায় যাত্রীদের সাহায্য সহযোগিতা করতেন।পরিব্রাজক ট্রাভানিয়ার নিজের চোখে দেখে লিখেছিলেন।

    ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে (১৫ই শাওয়াল ১০৮৭ হিজরী) সম্রাট আওরঙ্গজেবের কন্যা জেবুন্নেশা কুরআন তফসির করার সৌজন্যে জনৈক বুজুর্গ আলেম শফি বিন ওয়ালি আল কাজভিনি মতো বিদগ্ধ পন্ডিত মানুষকে নিজ খরচায় “সালামত রাস” নামে রাজকীয় জাহাজে হজ করতে পাঠান, সঙ্গে অবশ্যই রাজ পরিবারের সদস্যদের ও পাঠান।তিনি যাত্রা পথে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে একটি বই রচনা করেন যার নাম “আনিস- আল -হজ” বইটি প্রিন্স অফ ওয়াস জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

    ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাবরের কন্যা আকবরের ফুফু গুলবদন হিন্দুস্তানের সম্রাজ্ঞী রূপে পবিত্র হজযাত্রা সমাধা করে হজ কার্য সমাধান করেছিলেন। মুঘল যুগের মহিলাদেরও হজ যাত্রায় প্রবল আগ্রহ ও স্বাধীনতা ছিল এর থেকেই জানা যায়। তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গিয়েছিলেন আরও ১০ জন রাজকীয় নারী যথা -১) গুলবদন বেগম – বাবরের কন্যা , আকবরের ফুফু।২) সেলিমা সুলতান বেগম- বৈরম খার স্ত্রী ,আকবরের ফুফাতো বোন।৩) গুলজার বেগম- হুমায়ুনের ভাই কামরানের কন্যা, আকবরের চাচাতো বোন। ৪) হাজী বেগম – হুমায়ুনের ভাই কামরানের কন্যা ,আকবরের চাচাতো বোন ।৫) সুলতানা বেগম- হুমায়ুনের অপর ভাই আসকরি র স্ত্রী ।৬) উম্মে কুলসুম খাতুন – গুলবদনের পৌত্রী।৭) গুলনার আগা – বাবরের স্ত্রী ।৮) বিবি সাফিয়া ৯) বিবি সারাও শাহী ১০) শাহাম আগা- সম্রাজ্ঞীর খাস সহচরি । ১১) সালমা খানম- খিজির খাজা র কন্যা।
    এই হজ যাত্রায় মীর হজ ছিলেন সুলতান খাজা নাক্সবন্দী।

    তথ্যসূত্র-১) ড. আসাফ সাঈদ (ইয়েমেনে ভারতের রাষ্ট্রদূত, অনুবাদ সালেহ শফিক।
    ২) ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাবরের কর্নার হজ যাত্রার এগারো জন রাজকীয় হজ যাত্রীর নামের তালিকা সংগ্রহ করি চৌধুরী আতিকুর রহমান মহাশয়ের লেখা থেকে।