স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান ছিলেন বর্ধমানের গর্বের মানুষ

এম এস ইসলাম,বর্ধমান :  খলিলুর রহমান জন্ম গ্রহণ করেন অবিভক্ত বর্ধমান জেলার কালনা থানার অন্তর্গত টোলা গ্রামে ইংরেজি ১৯২২ সালে । ছোট বেলা থেকে কাকা স্বাধীনতা সংগ্রামী আব্দুস সাত্তারের অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান করেন । দামাল ছেলে খলিলুর রহমান ছোট বেলা থেকেই এলাকার অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে এলাকায় হুল্লোড় জাগিয়ে তুলছিলেন। বছর দুয়েক আগে থেকেই দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছোটখাটো আন্দোলনে পা মিলিয়ে চললেও উপযুক্ত কর্ম যোগ ঘটছিল না। সময় এসে গেল হাতের কাছে। পার্শ্ববর্তী হুগলি জেলার পাকা রাস্তা দিয়ে ইংরেজ সেনা ও অস্ত্র-শস্ত্র সজ্জিত ট্রাক যাবার খবর পেয়ে ই আগেভাগেই নেশা জেগে গিয়েছিল ধ্বংসের। “কিছুতেই সেনা এবং অস্ত্রশস্ত্র এখান দিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না” এই সংকল্পে উদ্বুদ্ধ হয়ে , তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই রাস্তা উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তা পালনও করেছিলেন। তখন তিনি বৈদ্যপুর জর্জ ইনস্টিটিউশন এর দশম শ্রেণীর ছাত্র। ঘটনার পর থেকেই সে এলাকা থেকে তিনি বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিলেন। পরে কোন এক সময় এলাকায় ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় কিছু মীরজাফরের দল স্বার্থসিদ্ধির লোভে নিজেদের ইংরেজ তোষণ চালিয়ে যেতে সে খবর তৎকালীন কর্তৃপক্ষের কানে তুলে দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে খলিলুর রহমান কে গ্রেফতার করা হয়। প্রথাগত শিক্ষার পরিসমাপ্তি তখন থেকেই।

    এলাকার গর্ব টোলা গ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামী পরিবারের এক উজ্জল সন্তান এবং একজন স্মরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেন এই খলিলুর রহমান সাহেব। নিজের ছোট কাকা গণ্যমান্য স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব স্বাধীনতা সংগ্রামী আব্দুস সাত্তার সাহেব (যিনি পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতবর্ষে জাতীয় কংগ্রেসের বর্ধমান জেলা সম্পাদক এবং বাংলার শ্রম মন্ত্রী হিসেবে বিধান রায়ের মন্ত্রিসভায় নিজের সুপরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং যার যোগ্য সহধর্মিনী ছিলেন নুরুন্নেসা সাত্তার সাহেব, যিনি একাধিকবার রাজ্য সরকারের বিধায়ক হিসেবে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন )। যোগ্য ভাইপো হিসেবে সাত্তার সাহেবের কাছ থেকেই রাজনৈতিক ভাব ভাবনার হাতেখড়ি। রাস্তা ভাঙ্গার মত তৎকালীন দেশবিরোধী এবং হিংসাত্মক অপরাধে গ্রেপ্তার করার পর আলিপুর সেন্ট্রাল জেল এবং হুগলি জেল মিলিয়ে দু’বছর দশ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় তাঁকে। এ পর্যায়ে তাঁর পরিবারকে অনেক সামাজিক হয়রানি ও অর্থদণ্ড বরবাদ করতে হয়েছিল। জেলে থাকাকালীন স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অতুল্য ঘোষ, প্রফুল্ল সেন ইত্যাদি গণ্যমান্য মানুষের সংস্পর্শে তিনি লালিত হয়েছিলেন। জেলে বসেও এদের কাছ থেকে ইংরেজি শিক্ষার পাঠ গ্রহণ করে তিনি ধন্য হয়েছেন। সাহিত্য রচনাার প্রতি সহজাত অনুরাগ ছিল তাঁর। তাঁর লেখনি সেই অর্থে প্রকাশিত না হলেও লেখালেখির প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ এবং পারদর্শিতার পরিচয় রেখেও তিনি এই বিষয়ে থেকে গেছেন নিভৃতচারী হিসেবে। উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেসব আজ অন্তর্হিত।
    পরবর্তীকালে স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীর বর্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে ভারত সরকার প্রদত্ত তাম্রপত্র প্রাপক হিসেবে ইনি সম্মানিত হন। অল ওয়েস্ট বেঙ্গল ফ্রিডম ফাইটারস অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি যুক্ত ছিলেন। মহামান্য রাজ্যপালের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা দিবসে তিনি বেশ কয়েকবার আমন্ত্রিত হিসেবে যোগদানের সম্মান পেয়েছিলেন। জীবনে কখনো তিনি সুযোগ সন্ধানী হিসেবে নিজের পরিচয় দেননি। একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত থেকে অতি কষ্টে তিনি বড় পরিবার নিয়ে দিন গুজরান করে গেছেন। আশি বছর বয়সে ,১৬ অক্টোবর ২০০১-এ স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান পরলোক গমন করার সময় তার সুযোগ্যা সহধর্মিনী সেতারা বেগম সহ আট সন্তান-সন্ততি বর্তমান রেখে গেছেন। তোলা গ্রামের দক্ষিণপাড়ার কবরস্থানে আব্দুস সাত্তার সাহেবের সমাধির পার্শ্ববর্তী স্থানেই তাকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে টোলা গ্রামের পবিত্র কবরস্থান সংস্কার করার সময় তাঁর বাঁধানো কবর এবং স্মৃতিফলকটিও অন্তর্হিত হয়ে গেছে , যেটা খলিলুর রহমান সাহেবের শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে অত্যন্ত বেদনা দীর্ণ একটি বিষয়।