শরিফাবাদ থেকে পীর বাহারাম সক্কা : বর্ধমান জেলার অজানা ইতিহাস

শেখ মনোয়ার হোসেন,বর্ধমান, ২৪নভেম্বর : মধ্যযুগের সুবে বাংলার বর্ধমানের বাদশাহী নাম শরিফাবাদ, শরীফ শব্দের অর্থ সম্ভ্রান্ত বোঝায়। অর্থাৎ শিক্ষিত মার্জিত সম্ভ্রান্ত মানুষের বাস ছিল এই বর্ধমানে। এই জন্যেই এর নাম শরিফাবাদ।

” পীর বাহারাম মসজিদ” এই মসজিদটি পুরাতন চখের পীর বাহারাম রোডের ওপর অবস্থিত। এই পীর বাহারামে শুয়ে আছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পীর দরবেশ হাজী সাক্কা বাবা অর্থাৎ “পীর বাহারাম সক্কা”।
পীরের নাম অনুসারে এই জায়গাটির নাম হয় পীর বাহারাম এবং রাস্তাটির নাম হয় পীর বাহারাম রোড,
এই দরবেশের কবরস্থানের প্রাঙ্গনে শুয়ে আছেন ঐতিহাসিক দুজন ব্যক্তিত্ব শের আফগান ও কুতুব উদ্দিন, সম্রাজ্ঞী নুরজাহানের সাথে এই দুই সমাধির চরিত্র অঙ্গী ভাবে যুক্ত।”শাহ ওয়ার্দ্দী বায়াত” পারস্যের তাবলীগ শহরে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি তুর্কি পারস্য হাজার বাইজান অঞ্চলের গভর্নর অর্থাৎ এই তিন প্রদেশের নাজিম ছিলেন, প্রথা অনুযায়ী শাহ পদবি পারস্যের রাজবংশের মানুষরা ব্যবহার করতেন। তিনি ছিলেন ক্ষুরধার জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন কবি এবং সুসাহিত্যিক ওনার অনেক কবিতা ফার্সিতে আছে। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহের সঙ্গে হুমায়ুনের যুদ্ধে “সম্রাট হুমায়ুন” কে হিন্দুস্তান ত্যাগ করতে হয়। তখন তিনি পারস্যের পথে “নাজিম- শাহ ওয়ার্দ্দি বায়াত” এর আশ্রয় ছিলেন সময়ের অপেক্ষার জন্য। শাহ ওয়ার্দদী বায়াত হজের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, হজ সমাধা করে রাজ কার্যে যোগ না দিয়ে মানব সেবায় মননিবাস করেন। এবং একটি নতুন পন্থা অবলম্বন করলেন মানুষকে পানি পান করানো। পিঠে পানির মশাক নিয়ে মরুভূমির বুকে ক্লান্ত পথিকদের সাধারণ মানুষদের জলপান করানো শুরু করেন। মক্কা থেকে নাজাফ্ পর্যন্ত রাস্তায় জল দান করতে করতে নিজের কাঁধে মসাকের ফিতেই ঘা হয়ে যায় তবুও তিনি মানুষকে জল দান করছেন নাম হয়ে যায়। ” বাহরাম সাক্কা” অর্থাৎ “জল দানকারী মানব”
হজ কার্য সমাধা করে আর রাজ সিংহাসনে মন চাইলো না বসতে। তিনি বেরিয়ে পড়লেন হিন্দুস্তানের উদ্দেশ্যে। তিনি জানতেন তিনি একসময় হুমায়ুনকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তাই গন্তব্য হল দিল্লি।
১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে ২৭ শে জানুয়ারি হুমায়ুন মৃত্যুবরণ করেন, আকবর নাবালক অবস্থায় সিংহাসন আরোহণ করেছেন কিন্তু তিনি সম্রাট হুমায়ুনের কাছে সব ঘটনার কথায় জানতেন তাই তিনি হাজী দরবেশ সাক্কা বাবাকে আহ্বান করে দিল্লির দরবারে অতিথি আপ্যায়নের আমন্ত্রণ জানালেন, তিনি রাজ দরবারে জ্ঞ জ্ঞানীগুণী বিভিন্ন মানুষের সাথে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করলেন এবং সুখ্যাতি বাড়তে লাগলো সঙ্গে তিনি দিল্লি আগ্রার পথে ফের নতুন করে জল দান করতে শুরু করলেন ক্লান্ত পথিকদের মাঝে, শোনা যায় আবুল ফজলের সাথে মনোমালিন্য হলে তিনি আবার বেরিয়ে পড়েন সিংহলের উদ্দেশ্যে। পথমধ্যে শুবে বাংলায় শরিফা বাদে উপস্থিত হলেন।
১৫৬০ থেকে ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শুভ বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন গিয়াস উদ্দিন জালাল শাহ,
“বাহারাম সাক্কা “বাবা বর্ধমান এ অর্থাৎ শরিফা বাদের এই জায়গায় উপস্থিত হয়ে দেখলেন যে, এখানে একজন বৌদ্ধ /জৈন , “যোগী জয়পাল “এই আশ্রমে বিরাজ করছেন। প্রথমে সংঘাত পরে বন্ধুত্ব, এবং এত জ্ঞানের খিদে দ্রুত তাদের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি হয় যোগী জয়পাল বাহারাম সক্কার কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, এবং ইসলামের সুশীতল ছয়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। নতুন নাম হয়” দ্বীন মোহাম্মদ”।
৯৭০ হিজরী অর্থাৎ ১৫৬২-৬৩ খ্রিস্টাব্দে বর্তমানে মৃত্যুবরণ করেন।(শিলালিপিতে লিপিবদ্ধ আছে যা আজও বর্তমান) ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে” সম্রাট আকবর” “বাহারাম সাক্কা” বাবার সমাধিটি নির্মাণ করে দেন, সঙ্গে পুরাতন চখ ,ফকিরপুর, মির্জাপুর ,ও রায়ান মৌজা গুলিকে” বাহারাম শাক্কার সমাধি ও মসজিদ “পরিচালনার জন্য দানের ফরমান দান করেন। এবং প্রতিদিন দু টাকা দান করার জন্য অনুদান ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে একটি পুকুর ও কবরস্থান মিলিয়ে তেরো একর জায়গা অবশিষ্ট আছে।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট ওই চারটি মৌজাকে ১৪০ টাকা ১২ পয়সা ভাতার বিনিময়ে নিজেদের নিয়ে অধীনে নিয়ে নেন। এবং এরও পরবর্তী সময়ে বর্ধমান রাজা সম্পত্তিগুলিকে ব্রিটিশ গর্ভমেন্টের কাছে নিজের জমিদারি অংশ হিসাবে হস্তগত করে নেন।
১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দের প্রাচীন দুটি শিলালিপি পীর বাহারাম সমাধির সামনে দেয়ালে লাগানো আছে, যার ফার্সি অর্থ-
১) হে আল্লাহ !হে উন্মুক্তকারী !হে আল্লাহ !হে উন্মুক্তকারী !হে আল্লাহ !আল্লাহ ছাড়া প্রভু নাই – মোহাম্মদ আল্লাহর রাসূল !ইহা সত্য।
২) নিশ্চয়ই বাহারাম ছিলেন পৃথিবীর বিখ্যাত দরবেশ -যার অন্তকরণ সমুদ্রের মতন (পূর্ণ ছিল) সত্য কার জ্ঞানে!
৩) সিংহল যাবার পথে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। ৪) কখনো এই বিশেষ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল তার হিসাব বিজয় দানকারীর ( আল্লাহর ) কাছে জানতে চাইলে। ৫) একটি (অদৃশ্য) স্বর বলে উঠলো যে মৃত্যুর তারিখ হল- দরবেশ বাহারাম সাক্কা। অর্থাৎ আব জাদ বা অক্ষরের সাংকেতিক হিসেবে ৯৭০হিজরি অর্থাৎ ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দ)।দ্বিতীয় শিলা লিপি টিভি র ফারসি অর্থ-
১) “বাহারাম যিনি জল দান করার জন্য বিখ্যাত ছিলেন কোন ছল ছুতা না করেই -বিদ্বান ছিলেন বিজ্ঞানে, পার্থিব ও ধর্মীয় জ্ঞানে কোন( রীতিসম্মত) শিক্ষা ছাড়াই। ৯৭০ হিজরীতে তিনি ত্যাগ করেন এই পৃথিবীর, এই দেশ থেকে -যেখানে তিনি গড়েছিলেন একতার তোরণের উপরে (প্রীতির )সম্পর্কের তাঁবু আর তারপর সম্মিলিত হন পরম সত্যের( আল্লাহর) সঙ্গে।)।