| |
|---|
নিজস্ব সংবাদদাতা : উত্তর ২৪ পরগনা জেলা নেতৃত্বের উদ্যোগে ফ্রন্ট পেজ একাডেমীর সহযোগিতায় হাড়োয়া স্টেশনের পাশে ফ্রন্ট পেজের শিক্ষক শিক্ষণ বিল্ডিংয়ের সেমিনার হলে গত ২৭-২৮ ডিসেম্বর বঙ্গীয় সাহিত্যিক অনুসন্ধান ট্রাস্টের এর দুদিন ব্যাপী যে রাজ্য সম্মেলন -২০২৫ অনুষ্ঠিত হল। সম্পাদক রুহুল আমিন জানালেন, সাহিত্যিক অনুসন্ধান সমিতি থেকে ট্রাস্ট, দেখতে দেখতে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেল’-সত্যিই কি এত সহজ-সরল ও আপাত নিরীহ বাক্যের মত বঙ্গীয় এই চেতনা ও সংস্কৃতিক বিকাশ মঞ্চের পথ চলা পিছনের দিকে তাকাই- মনে পড়ে যায় কত শত অম্লমধুর স্মৃতিকথা। নানান ঘাত-প্রতিঘাত থমকে যাওয়া, উঠে দাঁড়ানো আর নিষ্ঠুর রাতে ভিড় করে আসা আত্মক্ষরণ। পরক্ষণেই বঙ্গীয় সহযোদ্ধাদের কথা মনে পড়তেই এগিয়ে যাওয়ার সাহস দখিনা বাতাসের মতো ছুটে আসে। মনে পড়ে প্রান্তিক সমাজের উদীয়মান নিভৃতচারী মুখগুলি- যাঁরা নিরন্তর সংগ্রাম করছেন আমাদের প্ল্যাটফর্মকে অবলম্বন করে পরিচিতির পাদপ্রদীপে উঠে আসার। চলার পথে কিছু সাথী ও অভিভাবকতুল্য গুণীজনরা আমাদের ছেড়ে দূর আকাশের তারা হয়ে গেছেন । তবে আঁধার রাতের পথ চলায় তাঁরা আলো দিয়ে চলেছেন। সভাপতি ডক্টর রমজান
আলির মতে,আমরা পিছিয়ে পড়ারা, জাত-পাত-ধর্ম নির্বিশেষে চেতনায় অনুরণ তোলার চেষ্টা করে চলেছি। তবে এখন অবশ্য বৃহত্তর বঙ্গীয় সমাজের প্রতিটি কোণায় সেইভাবে পৌঁছাতে পারিনি সত্য। এ ব্যাপারে আমাদের সদস্যভুক্ত প্রতিটি জেলার অনুসন্ধানকারীদের আরও বেশি মাটির স্তরে নেমে ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানের পাশাপাশি প্রতিভা অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। পিছিয়ে পড়া অন্যান্য সমাজের প্রতিনিধিদের বিশেষ করে মূল নিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব আমরা এখনও সেভাবে বাড়াতে পারিনি। এ ব্যাপারে প্রত্যেকের সু-পরামর্শ কামনা করি। প্রাকৃতিক নিয়মে কোনো একটি বিষয় নিয়ে মতান্তর ঘটতেই পারে, কিন্তু তা যেন কখনোই বিরোধের স্তরে না পৌঁছায়। এই ব্যাপারে আমরা সদা সতর্ক থেকেছি।
হাড়োয়া মাজমপুরের কবি ও অনুবাদক মোঃ হাসানুজ্জামান জানালেন হাড়োয়া স্টেশন নিকটবর্তী ফ্রন্টপেজ অ্যাকাডেমিতে করতে চাইলে আমি যোগাযোগ করতে পারি। সেই প্রস্তাব জনাব মুহম্মাদ কামরুজ্জামান সাহেবকে, তিনি ফ্রন্টপেজ অ্যাকাডেমিতে অনুষ্ঠানের অনুমতি দিয়েছিলেন। পাশাপাশি ধন্যবাদ জানাই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, উত্তর ২৪ পরগনা জেলা অভ্যর্থনা কমিটিকে যারা এই অনুষ্ঠানটিকে সফল করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। বারাসাত এ জেলা কমিটির মিটিং উপস্থিত ছিলাম। |তারপর ফ্রন্টপেজ অ্যাকাডেমিতে জেলা কমিটির সদস্যগণ একাধিক মিটিং করেছেন। সঙ্গে রাজীব হাসান, আব্দুস সালাম ও সামসুর রহমান সাহেবের সহযোগিতার কথা আলাদা ভাবে বলতেই হয় । রাজীব হাসান বাজার থেকে রান্নার ব্যবস্থাপনায় নিরন্তর পরিশ্রম করেছেন। আব্দুস সালাম ভাই দিনাজপুর, মালদার থেকে আগত প্রতিনিধি এবং মেয়েদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন। সামসুর রহমান ছেলেদের থাকার বিশাল আয়োজন করেছিলেন নিজের বাড়িতে। রাতে কফির সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা আর পথ শিল্পী সফিউল্লার গান।| মুখে লেগে আছে। ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ ক্ষেত্র সমীক্ষায় চন্দ্রকেতুগড় ঘুরে পদ যাত্রায় যোগ দেওয়া। তারপর সারাদিন ঠাসা প্রোগ্রাম।
গত ২৭-২৮ ডিসেম্বর বঙ্গীয় সাহিত্যিক অনুসন্ধান ট্রাস্টের এই দুদিন ব্যাপী রাজ্য সম্মেলন -২০২৫ হল উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ফ্রন্টপেজ অ্যাকাডেমিতে, সেখান থেকে আমাদের প্রাপ্তি কম নয়। এই উপলক্ষ্যে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই শতাধিক কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্বগণের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে নারীদের উপস্থিতি এবং শিশু কিশোরদের উৎসাহ উদ্দীপনা। বিগত পাঁচ বছর ধরে বঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উদীয়মান ও নিভৃতচারীদের অনুসন্ধান করে প্রচারের পদপ্রদীপে তুলে আনার নিরন্তর প্রয়াস এই প্লাটফর্মেকে আর পাঁচটা সাহিত্য সংগঠন থেকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। মুস্তারী বেগম, রাফিয়া সুলতানা, সামজিদা খাতুন, রুবাই শবনম, মীর শাহনাজ রহমান, সাবিনা ইয়াসমিন, সৈয়দ হাস্নে আরা, ফিরোজা বেগম, সৈয়দা বেনজির আসরার, রোজিনা বেগম, স্বামিমা আসমান, সাবিনা সৈয়দ প্রমুখ নিভৃতচারীরা এই আঙিনা থেকে আজ পরিচিত মুখ হয়ে উঠছেন। সোনা বন্দ্যোপাধ্যায়, নিসার আমিন, ড. নুরুল ইসলাম,ডাঃ শামসুল হক,মোঃ আব্দুর রশিদ, নজরুল ইসলাম,পাহাড়ী খাঁন, রেজানুল করিম, মঞ্জু লস্কর, সফিকুল ইসলাম দুলাল, কবি গোলাম রসুল প্রমুখ উপদেষ্টামন্ডলীর নিরন্তর পরামর্শে সংগঠন সমৃদ্ধ।
ফ্রন্টপেজ অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান মুহাঃ কামরুজ্জামন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ও ট্রাস্ট সভাপতি ড. রমজান আলি ট্রাস্ট পতাকা উত্তোলন করেন। তারপর সমবেত জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে ঐদিন মূলমঞ্চে ৩ টার সময় অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথম পর্বে সভাপতি হিসেবে ছিলেন ইতিহাস ও সাহিত্য অনুসন্ধানে গবেষক আলিমুজ্জামান সাহেব। বিশিষ্টদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ই সি এল এর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (এইচ আর )নজরুল ইসলাম ,বেতার নাট্য সম্পাদক রফিউদ্দিন, ঔপন্যাসিক রুবাই শবনম প্রমুখ। স্বাগত ভাষণ দেন মোঃ হাসানুজ্জামান। উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন সংগীত রচয়িতা, সুরকার ও গায়িকা তুহিনা হক। বিশিষ্টদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক ও রবীন্দ্র গবেষক অতনু কুমার বসু, সাহিত্যিক ও মালালা একাডেমির সম্পাদক -আকমাল হোসেন , পথশিল্পী সেক সফিউল্লাহ, কবি জয়দেব মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক ড.বিমল কুমার থান্দার প্রমুখ। কবিতা পাঠ করেন আব্দুর রহমান, কেতকী মির্জা,আব্দুল গফফার,মোহাম্মদ আলিউল হক, সাহেব মিঞা,স্বামিমা আসমান প্রমুখ।
দ্বিতীয় দিন ২৮ ডিসেম্বর, রবিবার সকাল ৯:৩০টা হাড়োয়া রোড রেল স্টেশন থেকে পদযাত্রা শুরু হয় এবং শেষ হয় ফ্রন্টপেজ অ্যাকাডেমি এসে। এদিন ১০টা -১২টা -নারী ও শিশু-কিশোর অধিবেশন বসে । উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, কবি ও কথাকার রাফিয়া সুলতানা। শিশু কিশোররা রোজিনা ম্যাডামের গানে গলা মিলিয়ে। সবাইকে হাতে হাতে হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেয়।
দুপুর ১২টা -১:৩০টা শিক্ষা ও চেতনা অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রান্তিক সমাজের জীবন-জীবিকার চলমান সমস্যা ও উত্তরণ ভাবনা নিয়ে বিশেষ ভাবে মতামত বিনিময় ও আলোচনা হয়। এই পর্বে সভাপতি ছিলেন দেওয়ান আবদুল গণি কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবদুল অহাব মতামত বিনিময় করেন সামসুর রহমান, মোজাফফর রহমান ও ড.মশিহুর রহমান। সঞ্চালনায় মোল্লা সফিকুল ইসলাম দুলাল।
২:৩০টা -৩:৩০টা কথাসাহিত্যিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কথাসাহিত্যে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জীবন ও চরিত্র নির্মাণের ইতিকথা এবং আমাদের দায় -দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হয় । বিশেষ উপস্থিতি, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুল্লাহ শামিম, চন্দ্রপুর মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহাসান করিম, দৈনিক আপনজন পত্রিকার এডিটর -জাইদুল হক, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেক আবুল, বাংলার রেনেসাঁ পত্রিকার সম্পাদক আজিজুল হক, প্রধান শিক্ষক ও সমাজ দরদী গোলাম কিবরিয়া মিদ্দা প্রমুখ । আমাদের আরও বড় বেশি করে পাঠক হতে হবে, এ কথা মনে করিয়ে দেন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল্লাহ শামীম।
উল্লেখ্য ট্রাস্টের পঞ্চ বার্ষিকী উপলক্ষে এই রাজ্য সম্মেলনে প্রকাশিত হয় ‘সাহিত্যিক সম্মেলন স্মরণিকা -২০২৫’ যেটি ট্রাস্টের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, কর্মসূচি সহ বিগত দিনের সভা সমিতির এক ঝলক পাবেন। সঙ্গে ৬০ এর অধিক কলমচারী বঙ্গীয়র পথচলা, স্মৃতি ও অভিমত চলমান সাহিত্যের অন্যতম সংযোজন। এছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয় -সাহিত্যিক ডাইরেক্টরি -২০২৫, বঙ্গীয় নারী ভাবনা -২০২৫, মুহাঃ আকমাল হোসেনের কাব্যগ্রন্থ ‘বৃষ্টির পরজন্মে নদী’ হবো, সেক তাবারক আলীর উপন্যাস ‘পরকীয়া’। সংবর্ধনা দেওয়া হয় সাহিত্য সাধক সম্মাননায় -মোঃ মাহতাবুদ্দিন (ঝরাফুল ), বঙ্গীয় নারী প্রতিভা সম্মাননায় -মালা মুখোপাধ্যায়, বঙ্গীয় উদীয়মান গল্পকার সম্মাননা পান শামসুন নাহার, বঙ্গীয় স্মৃতি স্মারক সম্মাননা পান -কবি ও কথাকার রক্তিম ইসলাম, কবি ও ছড়াকার -এম আলাউদ্দীন , সাংবাদিক সফিউন্নিসা। এছাড়া বঙ্গীয় শিশু কিশোর প্রতিভা সন্ধান-২০২৫ সবুজের কলতান বিভাগে রাজ্যের ৯ জন শিশু প্রতিভাকেও উৎসাহব্যঞ্জক সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
প্রান্তিক সাহিত্যিকদের প্রচারের পাদপ্রদীপে তুলে আনতে ট্রাস্ট অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই সাথে আজকের যারা ফুল কুঁড়ি শিশু কিশোর তাদের প্রতিভা বিকাশে আমাদের নতুন উদ্যোগ সবুজের কলতানকে প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে অবিচল। এভাবেই কবিতা,গান, গজল, আলোচনায় দুদিনের রাজ্য সম্মেলন মুখরিত হয়ে ওঠে। আগামীতে লোক সাহিত্য লোকগানের উপর আরো বেশি জোর দেওয়া হবে এই অঙ্গীকারে নানান কর্মসূচি আর আগামীতে এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে রাজ্য সম্মেলন সমাপ্ত হয় । প্রান্তিক সাহিত্যিক ও উদীয়মান নিভৃতচারীদের পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসায় আমরা অঙ্গীকার দায়বদ্ধ ।


