প্রান্তিক মানুষের ‘সাথি’ কমরেড গুরুপদ’র জীবনাবসান, শোকাতুর রাজনগর

 

     

    খান আরশাদ, বীরভূম:

    বিগত শতকের ষাট থেকে আশির দশক ধরে বীরভূমের রাজনগরের আদিবাসী পাড়া থেকে শুরু করে ভাগচাষিদের ঝুপড়ি ঘর, সর্বত্র যাঁর ছিল অবাধ যাতায়াত, সেই প্রবীণ বামপন্থী নেতা কমরেড গুরুপদ স্বর্ণকার (৮৮) প্রয়াত হলেন। মঙ্গলবার রাত ১০টা নাগাদ সিউড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা নিয়ে কয়েক দিন আগেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে জেলার বাম আন্দোলনের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

    তাঁর বিলাসহীন জীবন যাপন ছিল পরবর্তী রাজনীতিবিদদের চলার পথের বার্তা।

    ১৯৩৮ সালে রাজনগরের গাংমুড়ি গ্রামের এক সম্পন্ন স্বর্ণকার পরিবারে জন্ম গুরুপদ স্বর্ণকারের। ১৯৫৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশনের পরেই রাজনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক নিত্যগোপাল চট্টোপাধ্যায়ের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাম রাজনীতিতে হাতেখড়ি। কিন্তু নিজের পারিবারিক সচ্ছলতাকে তুচ্ছ করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন দিনমজুর আর খেতমজুরদের লড়াইয়ের পথ। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা সঞ্চয় বলতে তাঁর কিছুই ছিল না। শেষ জীবনে বড়ো হয়ে ওঠা দুই কন্যার সেবায় এবং জ্যাঠাইমার একটি সাধারণ টিনের চালার নিচেই কেটেছে তাঁর দিন। কয়েক বছর আগে সাইকেল থেকে পড়ে পা ভাঙার আগে পর্যন্ত আদিবাসী গ্রামগুলোতে বিরতিহীন ভাবে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তাঁর দস্তুর। ভাঙ্গা পায়ে ক্রাচে ভর করে টোটোয় করে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন।

    গুরুপদ স্বর্ণকার ছিলেন আন্দোলনের রূপকার: অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি ও পরবর্তী সময়ে সিপিএমের দীর্ঘকালীন সদস্য গুরুপদবাবু বীরভূমের জেলা পরিষদের সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে পদের চেয়েও বড় পরিচয় ছিল তাঁর আন্দোলনের নেতৃত্ব।

    রাজনগর ব্লকে বর্গাদারদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও খাস জমি উদ্ধারে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

    গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য ‘ধর্মগোলা’ তৈরি করে খাদ্য সংকট মোকাবিলার এক অনন্য নজির গড়েছিলেন তিনি।

    স্বর্ণশিল্পী থেকে শুরু করে বিড়ি মজদুর সকলের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে।

    গুরুপদ বাবুর স্বেচ্ছা নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন: আশির দশকের শেষ দিকে ব্যক্তিগত শোক এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা নিভৃতবাসী হয়েছিলেন তিনি। বেশ কিছু সময় ঝাড়খণ্ড লাগোয়া গ্রামগুলোতেও অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে কাটিয়েছিলেন। তবে গত কয়েক বছর শয্যাশায়ী থাকলেও তাঁর কাছে সাধারণ মানুষের আনাগোনা কমেনি। স্থানীয়রা বলছেন, “তিনি ছিলেন এক রাজনৈতিক সন্ন্যাসী।”

    বুধবার সকালে প্রয়াত নেতার মরদেহ রাজনগর সিপিআইএম দলীয় কার্যালয়ে নিয়ে আসা হলে শোকের ছায়া নেমে আসে। শ্রদ্ধা জানান সিপিআইএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শীতল বাউরি, জেলা সদস্য শুকদেব বাগদী, এরিয়া সম্পাদক উত্তম মিস্ত্রি সহ কালো কোড়া, শিবদাস লোহার ও সুভাষ মণ্ডলের মতো নেতৃবৃন্দ। বীরভূমের প্রতিটি প্রান্তিক গ্রাম থেকে আসা মানুষের অশ্রুসজলের মধ্য দিয়ে বক্রেশ্বর মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

    রাজনগরের ধুলোমাখা পথে আর হয়তো দেখা যাবে না সেই চেনা মানুষটিকে, কিন্তু ঝাড়খণ্ড সীমান্ত আর বীরভূমের আদিবাসী গ্রামগুলোর লোকগাথায় থেকে যাবেন ‘জনতার কমরেড’ গুরুপদ স্বর্ণকার।

     

     

     

     

    নতুন গতি

    News Publication