মোশারফ-চঞ্চলরাই এখন ‘ঘরের ছেলে’, বাংলাদেশি নাটকের তুঙ্গ চাহিদা ভারতে

নতুন গতি ডিজিটাল ডেস্ক: আর ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশের নাটকের দর্শক বা ‘ভিউয়ার’ সংখ্যা রীতিমতো রেকর্ড গড়ে চলেছে। এপারের ভাষার ডাক পৌঁছে যায় ওপারে। আবার যেন অনুরণন হয়ে ফিরে আসে এপারে। বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি যুগের শুরু থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে ওপার বাংলার টিভি চ্যানেলের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের দর্শকদের।

প্রতিবেশী দুই দেশ, মাঝে হাজার কিলোমিটারের কাঁটাতার ঘেরা সীমান্ত। এপারের ভাষার ডাক পৌঁছে যায় ওপারে। আবার যেন অনুরণন হয়ে ফিরে আসে এপারে। সৌজন্যে এক এবং একমাত্র শিল্প-সংস্কৃতি। তবে, দুই বাংলার সিনেমার মসৃণ আদানপ্রদানের কথা বারবার আলোচনা হলেও কূটনৈতিক জটিলতায় তা এখনও প্রায় দিবাস্বপ্নই রয়ে গিয়েছে। কিন্তু এপার বাংলার ‘দাদাগিরি’ হোক বা ‘মীরাক্কেল’ অথবা ‘শ্রীময়ী’- চোখের পলক না ফেলেই যেন দেখতে অভ্যস্ত বাংলাদেশের মানুষজন। আর ওপার বাংলা? ঠিক এই জায়গাটিতেই কেল্লাফতে করছে বাংলাদেশের নাটক। ইউটিউবের সৌজন্যে ওপারের মোশারফ করিম, আখম হাসান চৌধুরী, চঞ্চল চৌধুরীরা যেন হয়ে উঠছেন ভারতের বাঙালি মননেরও মনের মানুষ। আর ঠিক এই কারণেই বাংলাদেশের নাটকের দর্শক বা ‘ভিউয়ার’ সংখ্যা রীতিমতো রেকর্ড গড়ে চলেছে।

‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৮’-এর সমাপ্তি অনুষ্ঠানে আড্ডায় মেতেছিলেন দুই বাংলার গুরুত্বপূর্ণ দুই কথাসাহিত্যিক– শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও ইমদাদুল হক মিলন। ‘বাংলাদেশের টিভি নাটকের নিয়মিত দর্শক আমি’, শীর্ষেন্দুর মুখে কথাটা শুনে নড়েচড়ে বসে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনের উপচে পড়া দর্শক। উপস্থিত দর্শকদের চেহারায় ফুটে ওঠা অস্বস্তির রেখাটা চট করে পড়ে নিলেন ‘মানবজমিন’ লেখক। বললেন, ‘এখানকার টিভি চ্যানেল ভারতে দেখানো হয় না। আমি নাটক দেখি ইউটিউবে।

বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি যুগের শুরু থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে ওপার বাংলার টিভি চ্যানেলের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের দর্শকদের। বিপরীতে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেখানোই হয় না ভারতে। মাঝেমধ্যে দুই-একটি চ্যানেল দেখা যায়, কয়েক দিন পর আবার বন্ধ। ফলে এপারের দর্শকদের অভ্যস্ত করাতে পারেনি বাংলাদেশি চ্যানেলগুলো। বাধা না পেলে এপার বাংলাও হত বাংলাদেশি বিনোদনের অন্যতম গ্রাহক।

পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও অসমের বাঙালিরা টিভির অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে অনেক কসরত করে দেখতেন বিটিভি। সেখানকার নাটক, ম্যাগাজিন আর গানের অনুষ্ঠান দেখার স্মৃতি পাওয়া গেছে বিখ্যাত লোকেদের দিনলিপিতে। ‘একতলা দোতলা’, ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘ঢাকায় থাকি’, ‘সংশপ্তক’ ধারাবাহিকের প্রতি পর্বের জন্য বাংলাদেশের মতো অপেক্ষা করে থাকত এপার বাংলাও। বিটিভির ১৯৭৯ সালের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘সকাল সন্ধ্যা’র অভিনেত্রী আফরোজা বানু এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, কলকাতায় গেলে রাস্তায় বের হতে পারতেন না। লোকজন চিনে ফেলত, দিতে হতো অটোগ্রাফও। বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা-গায়কদের তখন বেশ কদর ছিল এপারে। সেই পরিস্থিতি আমূল বদলে গিয়েছে নতুন শতাব্দীর শুরুতে।

২০০৩ সালের কথা। কলকাতার নিউ মার্কেটে শপিং করতে দেখা গিয়েছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় এক চিত্রনায়ক ও এক জনপ্রিয় গায়ককে। তবে এটুকু বলা যায়, সেই চিত্রনায়ক টালিগঞ্জের কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। তাঁদের দুজনের দিকে আড়চোখে তাকাতেও দেখা যায়নি কাউকে। এমন আরও কিছু ঘটনার উদাহরণ টেনে বাংলাদেশের তারকারা প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করেন দেশীয় গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে। তাঁদের অভিযোগ, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভারতীয় শিল্পীদের খবর ছাপা হয় নিয়মিতই। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশি তারকাদের খবর প্রকাশিত হয় না বললেই চলে।

তবে পশ্চিমবাংলার শিল্পীরা অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের সংস্কৃতির খোঁজখবর ঠিকই রাখেন। জয়া আহসানকে পশ্চিমবঙ্গের ছবিতে সুযোগ দিয়েছিলেন অরিন্দম শীল, ‘আবর্ত’ ছবিতে। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে জয়ার সুযোগ হয়েছে টিভি নাটকের কল্যাণেই। দুই বাংলার দর্শকদের মেলবন্ধনে বড় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি বিনির্মাণের চেষ্টা চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। ঢালিউড-টালিগঞ্জের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত বেশ কিছু চলচ্চিত্র যে কাজটা করতে পারেনি, টিভি নাটক সেই কাজটা অনায়াসেই করে ফেলল। সারা বিশ্বের বাঙালি দর্শকদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার ভিত তৈরি হল এখানে। এই দর্শকদের নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতেই পারেন বিনোদন জগতের পুঁজিপতিরা।