শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম : শ্রমিক দিবস

ভূমিকা:

ইসলামে শ্রম একটি মহৎ গুণ এবং সমাজের প্রত্যেক সামর্থ্যবানদের জন্য পরিশ্রম করা বাধ্যতামূলক। প্রতিটি মানুষের নিজের জন্য এবং পরিবারের জন্য খাদ্য, পানীয়, পোশাক, ঠিকানা বা আশ্রয়, পথ্য, শিক্ষা সহ নানামুখী  প্রয়োজন পূরণ করতে হয়। বৈধ পন্থায় এ সকল প্রয়োজন মিটাতে গেলে তাকে কাজ করতেই হয়। তাই ভিক্ষাবৃত্তির বিষয়টি ব্যতীত আবশ্যিকভাবে মানুষকে কাজ করতেই হয়। এদিক থেকে নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কৃত কাজকেও ইবাদত হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। নিচে বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হল।

    একদিন রাসূল সঃ সাহাবিদের নিয়ে বসে ছিলেন তখন তারা দেখলেন এক যুবক সকাল সকাল কাজে লেগে গেছে। তা দেখে সাহাবাদের অনেকেই বলতে লাগলেন, যদি সে এ কাজ বাদ দিয়ে এ সময় ইবাদতে মনোনিবেশ  করতো তবে কতইনা ভাল হতো! রাসূল সঃ তাদের এ কথা বলতে শুনে বললেনঃ

    “এমন কথা বলনা! যদি সে স্বাধীনভাবে আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে কাজ করে তবে তা তার জন্য ইবাদত। যদি সে তার পরিবারের ভরণপোষণের লক্ষ্যে কাজ করে থাকে তবে নিঃসন্দেহে তা একটি মহৎ কাজ। যদি কেউ তার সক্ষমতা ও অর্থ নিয়ে গর্ব করে তবে সে শয়তানের কাজ করল।”

    এ বিষয়ে আয়েশা রাঃ বলেছেনঃ

    “নবী করীম সঃ এর সাহাবাগণ নিজেরদের প্রয়োজন মেটাতে কঠোর পরিশ্রম করতেন।”

    ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাঃ বলেছেনঃ

    “তোমাদের কেউ যেন কাজ না করে বসে বসে  আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেঃ ‘হে আল্লাহ আমাকে রিজিক দান করুন। কারণ তোমরা ভাল করেই জান আকাশ থেকে স্বর্ণ কিংবা রোপ্য বর্ষিত হয় না।”

    এ থেকেই বুঝা গেল ইসলাম সামাজিক উন্নয়নে শ্রমকে কিভাবে মূল্যায়ন করেছে। একই সাথে শ্রমিকের জন্য পর্যাপ্ত আইনও প্রণয়ন করেছে যেন তারা বঞ্চিত না হয়।

     

    ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা লেবার ইউনিয়ন গঠনের বহু আগেই ইসলাম শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, যে ব্যক্তি শ্রমিকের অধিকার পরিপূর্ণরূপে আদায় করল সে  যেন তার সৃষ্টিকর্তারই ইবাদত করল, কেননা আল্লাহ নিজেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং তার শেষ নবী (স.) এর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং আমাদের অধিকার সমূহ সর্বশক্তিমান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত।

    তবে সকল অধিকারই ঠিক তখনই রক্ষিত হতে পারে যখন মানুষ এক সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে যে, তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং আচরণের ভিত্তিতে মানুষের শ্রেনীবিন্যাস করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর মাখলুকদের বঞ্চনার শিকার হওয়া পছন্দ করেন না, তাই তিনি তাঁর শেষ নবীর মাধ্যমে মানব জাতির কাছে এ বার্তাই প্রেরণ করেছেন। এবং বঞ্চনা ও অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে নিষেধ করেছেন। সকল মানুষ মিলেমিশে ন্যায় পরায়ণ হয়ে পাশাপাশি বসবাস করলে আমাদের রব খুশী হন।

     

    আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোর’আনে বলেছেনঃ

    “হে নবী! তারা কি তোমার মালিকের রহমত বন্টন করছে? (অথচ) আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের মধ্যে তাদের  জীবিকা বণ্টন করেছি, আমি তাদের একজনের ওপর আরেকজনকে (বৈষয়িক) মর্যাদা সমুন্নত করেছি, যাতে করে তারা একজন অপর-জনকে সেবক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু তোমার মালিকের রহমত অনেক উৎকৃষ্ট, তারা যেসব সম্পদ জমে করে তা তার চেয়ে বড়।” (৪৩:৩২)

    সবশেষে সকল মানব সম্প্রদায়কেই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে এবং প্রত্যেকেই তাদের অধীনস্তদের সাথে এবং আল্লাহর সৃষ্টির অধিকারের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। তাই, কাজ যেমনি হোক যতক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিক তার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে।

     

    রাসূল সঃ বলেছেনঃ

    “তোমার উপর তোমার ভাইয়ের অর্থ ও সম্মানের অধিকার রয়েছে, যদি তার পাওনা থাকে তবে সে দিন আসার আগেই তা পরিশোধ করে নাও যেদিন দিনার কিংবা দিরহাম দিয়ে পাওনা পরিশোধের সুযোগ থাকবেনা। তাই এর পরিবর্তে তার যদি নেক আমল থাকে তবে তা থেকে কেটে নিয়ে পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করা হবে। আর যদি তার কোন নেক আমল না থাকে তবে পাওনাদারের বদ আমল তার আমল নামায় যোগ করা হবে।” (বুখারী)

     

    ইসলামী শ্রম আইনে মালিক শ্রমিক সম্পর্ক

    প্রথম আলোচ্য বিষয় হচ্ছে মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক কেমন হবে? একজন শ্রম দেয় অপরজন বিনিময় পরিশোধ করে, তবে কি তাদের সম্পর্ক শুধুমাত্র এমন হিসেবের খাতাতেই নির্দিষ্ট? না কি শ্রম ও অর্থের বাহিরে অন্য কোন সম্পর্ক বিদ্যমান?

     

    এ বিষয়ে রাসূল সঃ কথা ও কাজের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন।

    তিনি চারপাশের সবার মাঝেই ন্যায়বিচার, ভালোবাসা ও সম্মান ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ়  করেছেন এবং নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি নিজে নিয়োগকর্তার পাশাপাশি শ্রমিক হিসেবেও কাজ করেছেন।

    প্রাথমিক জীবনে তিনি শ্রমিক হিসেবে অনেক বছর কাজ করেছেন এবং এক সময় সফল ব্যবসায়ীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। তাঁর উপর অর্পিত প্রতিটি দায়িত্বই তিনি সময়মত, যত্নসহকারে পালনের চেষ্টা করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল এর সবই তিনি নবুওয়াত লাভের অনেক বছর আগেই করেছেন।

    অপরদিকে একজন নিয়োগকর্তা হিসেবে, তিনি নিজেই প্রায় দশ বছর আপন সেবক আনাস বিন মালিকের সাথে মেঝেতে বসে একত্রে খাবার খেতেন। আনাস রাঃ বলেছেন রাসূল সঃ কখনো আমাকে ধমক দেন নিঃ

    “যখন আমি কোন কিছু করতাম কাজটি কেন করছি বলে কখনো তিনি কৈফিয়ত চান নি; যদি আমি কোন কাজ না করেছি তাহলেও তিনি কেন করলাম না তা জানতে চান নি। তিনি ছিলেন সকল মানবের মাঝে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি।”

    রাসূল সঃ বলেছেনঃ

    তোমাদের শ্রমিকগণ যাদের আল্লাহ তোমাদের অধীনস্ত করেছেন তারা তোমাদের ভাই, তাই নিজে যা খাবে তাদের  তাই খেতে দিবে, নিজে যা পরিধান করবে তাই তাদের পরিধান করতে দিবে এবং তাদের উপর এমন বোঝা চাপিয়ে দিওনা যা তাদের এবং তোমাদের সক্ষমতার বাইরে, তাদের কাজে সহযোগিতা কর।

    আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সঃ বলেছেনঃ

    “যে ব্যক্তি তার অধীনস্তের সাথে বসে আহার করে, এক গাধায় চড়ে বাজারে যায়, তার মেষের পালে সহযোগী তা করে এবং দুধ দহন করে তার মাঝে কোন অহংকার নেই।”  

     

    রাসূল সঃ আমাদের এ শিক্ষাই দিলেন যে, দিন শেষে তোমার শ্রমিক মানুষ হিসেবে তোমার ভাই এবং বিশ্বাসের  দিক দিয়েও তোমার ভাই তাই তোমার উচিৎ তাদের সম্মান রক্ষা করা। কর্মকর্তা ও কর্মচারী উভয়ের উচিৎ সততা, আমানতদারীতা এবং সম্মান রক্ষা করে চলা উচিৎ।

    বর্তমান সময়ের শ্রমিকদের প্রতি বিশ্বব্যাপী  অবজ্ঞা প্রকাশই তাদের প্রতি বঞ্চনা ও অবিচারের দুয়ার খুলে দিয়েছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনই কেবল একটি সু-সম্পর্কের দ্বার খুলে দিতে পারে এবং এভাবেই উভয় পক্ষ লাভবান হবে। শ্রমিককে যদি তার প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দেয়া হয় তবে সে সততা ও ঝুকি  নিয়ে কাজ করে যাবে। বিষয়টি মূলত যেমন দিবেন তেমন পাবেন। যে মালিক তার শ্রমিকদের সা্থে উত্তম আচরণ করেনা বরং তাদের প্রতি রুঢ় আচরণ করে ও তাদের অসম্মান করে সে কখনো শ্রমিকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ শ্রম আশা করতে পারে না বরং শ্রমিকরা মালিকের কাছ থেকে অধিকার আদায়ে সোচ্চার হলে উভয় পক্ষ ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

     

    শ্রমিকদের পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

    ইসলামে কাজ শেষে অবশ্যই তার পাওনা আদায়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আবু সাইদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল সঃ বলেছেন,

    “তোমাদের কেউ যখন শ্রমিক নিয়োগ দাও, কাজের আগেই তার পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে নাও।” (আব্দুর  রাজ্জাক)

    কেউ কারো জন্য কাজ করবে আর কাজ শেষে নাম মাত্র পারিশ্রমিক পাবে কিংবা পাবেইনা বিষয়টি সম্পূর্ণ  অমানবিক। হাদিসে কুদসীতে রাসূল সঃ সতর্কবাণী উচ্চারন করে বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

    “রোজ হাশরের দিন আমি তিন শ্রেণীর মানুষের বিপক্ষে দাড়াবোঃ প্রথমত যে আমার নামে শপথ করে তা ভঙ্গ করে; দ্বিতীয়ত যে স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মুনাফা ভোগ করে আর তৃতীয়ত যে কোন শ্রমিক নিয়োগ করে কাজ সম্পন্ন করে নেয় কিন্তু তার শ্রমানুসারে পারিশ্রমিক দেয় না।” (বুখারী)

    বিভিন্ন উন্নত দেশে অভিভাসিরা এবং মাল্টি বিলিয়ন কোম্পানিগুলোতে কিভাবে শ্রমিকগণ নিগৃহীত হচ্ছেন সে সকল গল্প বলে শেষ করা যাবেনা। এমনও কিছু দেশ আছে যারা মাস শেষে শ্রমিক ও কর্মচারীদের পারিশ্রমিক পরিশোধ করেনা। এদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাসূল সঃ সতর্কবার্তা দিয়েছেন এভাবে যেঃ

    “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও” (সুনান ইবনে মাযাহ)

    এই হাদিস দ্বারা স্পষ্টত বুঝা যাচ্ছে; শ্রমিকদের পারিশ্রমিক অবশ্যই সময়মত পরিশোধ করতে হবে। যদি কেউ কোন কাজের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে তবে অবশ্যই তা পরিশোধ করতে হবে। তবে যদি এমন কোন চুক্তি থেকে থাকে যেখানে বলা হয়েছে পারিশ্রমিক সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে পরিশোধ করা হবে তবে সেটা উল্লেখিত শর্ত অনুযায়ীই করতে হবে। রাসূল সঃ আরও বলেছেনঃ

    “যদি কেউ অন্যায় ভাবে কারো এক বিঘত পরিমাণ জমিন ছিনিয়ে নেয় তবে রোজ হাশরের দিন তার গলায় সাত স্তবক জমিন ঝুলিয়ে দেয়া হবে।”  

     

    পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকেই একটি চুক্তিতে আসতে হবে। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে কোন শ্রমিক মাত্র দশ সেন্ট প্রতি ঘন্টা হিসেবে কাজ করতে রাজী হলেই তা চুক্তি হিসেবে গণ্য হবেনা। কেননা অনেক  সময় দেখা যায় মানুষের এ ধরণের কাজে রাজী না হয়ে উপায় থাকে না, এর ফলে সে ধীরে ধীরে দরিদ্রতায় ডুবে যায়। ফলে একদিকে সে পরিবারের মুখে একবেলা আহার তুলে দিতে হিমশিম খায় যেখানে তাদের মালিক পক্ষ কফি খেয়েই বিলিয়ন ডলার খরচ করে। ইসলামের দৃষ্টিতে সময় ও অবস্থানের উপর ভিত্তি করেই ন্যায্যতার  ভিত্তিতে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে হবে।

     

    আল্লাহ কোর’আনে বলেছেনঃ

    “অতপর তোমরা ঠিকমত ওজন ও পরিমাপ কর, মানুষকে দেয়ার ক্ষেত্রে কম দিয়ে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করোনা, এবং আল্লাহর এ জমিনে শান্তি পুনঃস্থাপিত হওয়ার পর আবার বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা।” (আরাফঃ৮৫)

     

    ইসলামী আইনে শ্রমিকের বিশ্রামের অধিকার

    শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত ও অযাচিত কাজ আদায় করা উচিৎ নয়। তাদেরও শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামের অধিকার আছে। তাদের ইবাদতের সুযোগ দিতে হবে। ফলে শ্রমিকগণ যখন তাদের সৃষ্টি কর্তার হুকুম পালনের নিবিড় সুযোগ পাবে তখন তাদের কাজে আরও বেশি মনোযোগী ও উদ্যমী হবে। আবারও বলছি এ বিষয়টি অনেকটা ‘যেমন দিবেন তেমনি পাবেন’ এর মত।

    একই ভাবে শ্রমিকদের পরিবারকে সময় দেয়ার অধিকারও রয়েছে। নবী মুহাম্মদ সঃ এই বিশ্রাম নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেনঃ

    “তোমার উপর দেহ ও পরিবারের অধিকার রয়েছে।” (বুখারী)  

     

    যখন একজন মানুষ এতই বৃদ্ধাবস্থায় পৌঁছায় যে তার পক্ষে আর কাজ করা সম্ভব নয় তাহলেও সে পারিশ্রমিক পাবে। বৃদ্ধদের ভাতা প্রদানের নীতি সর্বপ্রথম দ্বিতীয় খলীফা উমর রাঃ চালু করেছিলেন, তিনি বলেছেনঃ

    “যৌবনে কারো কাছ থেকে সেবা নিয়ে বৃদ্ধাবস্থায় তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয়াটা কোন ভাবেই মানবিক হতে পারে না।”  

    রাসূল সঃ এ বিষয়ে বলেছেনঃ

    “যে তার শ্রমিকদের বোঝা হালকা করবে সে সেই অনুপাতে প্রতিদান পাবে।”

     

    দুঃখজনক হলেও সত্য, বাস্তব ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে বিশ্রাম নেয়ার অপরাধে শ্রমিকদের প্রহার করা হয়। অনেক দেশের শিশু শ্রমের দুঃখগাথা বলার কোন ভাষা নেই। যে বয়সে তাদের খেলতে বা স্কুলে যাওয়ার কথা সে বয়সেই তাদের নানান ঝুকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে যেতে হচ্ছে। যদি একে সামাজিক ও মানবিক অপরাধ বলা না যায় তবে আর কি বলা যাবে?

     

    উপসংহারঃ

    শ্রমিকদের প্রতি সমতা ও ন্যায় পরায়ণতার নীতিই কেবল হতে পারে সর্বাপেক্ষা মহৎ কাজ যার মাধ্যমে সমস্যার সামগ্রিক সমাধান সম্ভব। নিচে রাসূল সঃ থেকে বর্ণিত পূর্বের মানুষদের একটি গল্প দেয়া হলঃ

     

    “তিনজন ব্যক্তি সফরে গেলো, পথিমধ্যে বৃষ্টি নামলে তা থেকে বাঁচতে তারা একটি পর্বতের গুহায় আশ্রয় নেয়।  পাহাড়ের উপর থেকে বড় একটি পাথর নেমে আসলে তা দিয়ে গুহামুখ বন্ধ হয়ে যায়। তারা একে অপরকে বলতে লাগল সে কাজের কথা স্মরণ কর যা তুমি একনিষ্ঠভাবে শুধুমাত্রা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই করেছিলে,  এবং সে কথার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে এ বিপদ থেকে উদ্ধারের দোয়া কর। তাদের একজন বলল,

    ‘হে আল্লাহ! আমি একবার এক ফারাক (মাপ বিশেষ) চালের পারিশ্রমিকে একজন শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছিলাম, কাজ শেষ করে সে আমার কাছে এসে তার পারিশ্রমিক দাবি করল, কিন্তু যখন আমি তার সামনে প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিক উপস্থাপন করলাম সে তা নিতে প্রত্যাখ্যান করে আমাকে ফিরিয়ে দিল। আমি তার প্রাপ্য ধান কয়েকবার চাষ করলাম যতক্ষণ না তা বিক্রয়যোগ্য হয়, সেই টাকায় আমি কিছু গরু ও রাখাল ক্রয় করে তা লালন পালন করেছি। একদিন সে শ্রমিক আমার কাছে এসে বললঃ আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং আমার প্রাপ্য আমাকে বুঝিয়ে দাও।

     

    আমি তাকে বললামঃ এ সকল গাভী ও রাখাল তুমি নিয়ে যাও। সে তা নিয়ে চলে গেল। যদি তুমি মনে কর আমি শুধুমাত্র তোমার সন্তুষ্টির আশায় এ কাজ করেছি তবে আমাদের এ বিপদ থেকে তুমি উদ্ধার কর। পাথর গুহামুখ থেকে খানিকটা সরে গেল… এভাবেই তারা প্রত্যেকেই আপন কাজের কথা স্মরণ করে দোয়া করলে পাথর সরে গিয়ে তারা বিপদ থেকে উদ্ধার পেল।” (বুখারী)

     

    যদি ১৪শত বছর পূর্বের শেখানো নীতি বর্তমান মালিকপক্ষ অনুসরণ করেন তবে বিশ্বে সকল শ্রমিক তাদের প্রাপ্য অধিকার ও সম্মান ফিরে পাবে এবং কাজে মনোযোগী হবে। শ্রমিক জানবে তার মালিক তাকে বঞ্চিত করবে না  আর মালিক জানবে তার শ্রমিকেরা আল্লাহ্‌কে ভয় করে তাই তারা সততার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে সচেষ্ট হবে। এ ধরণের পরিবেশ গঠনের মাধ্যমেই মালিক শ্রমিক উভয় শ্রেণীই সফলতা লাভ করতে পারে।

     

    সংবাদ সৌজন্যে : ইসলামী বার্তা