আজকের নারী ও আমাদের সমাজ

আজকের বার ও আমাদের মানুষ
 
মোবারক মন্ডল, নতুন গতি, নদীয়া 
আমরা এক নবপ্রবর্তিত বিশ্বে স্থান অর্জন করি বর্তমানে আলোচনার সাথে প্রযুক্তি এবং শিক্ষার মতো পরিবর্তন হয়েছে, ঠিক তেমনি আমাদের নারীর অবস্থান এবং কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। একবারের মতো আলো জ্বলে উঠবে, প্রতিটি প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যবস্থা হবে, যাক না গোটা বিশ্ব অচল। আন্দোলনরত অগ্রগতি মূলে নারীর অবদান অন্বেষিত। উদ্বোধনের সময় মেয়েদের সাথে যোগ দেওয়া সবুজুগীর পুরস্কার, মেধা, শ্রাদ, বাধ্যবাধকতা, মৃত্তিকা পূর্বে উপস্থিত সাফল্যের সাথে দেখা হয়েছে, তার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে নতুন ইতিহাস।
 
কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আমাদের সমাজ প্রযুক্তি ও শিক্ষায় উন্নতি করতে পেরেছে, অথচ আজও নারীদের সম্মান, মর্যাদা, ও অবস্থান সমন্ধে বিন্দুমাত্র জ্ঞান অর্জন করতে পারেনি। আদিকাল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত নারীরা ধাপে ধাপে নিজেদের এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সমাজে আজও তারা অবহেলিত, অপমানিত হচ্ছে, কারণ তারা নারী। প্রাপ্তির পরিবর্তে মিলছে শুধুই শূন্যতা। হাজার প্রতিবন্ধকতা নারীর চলমান গতিকে শিথিল করে দিচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে অবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রনয়ন করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে এসেও পরিবর্তন হয়নি নারীর অবস্থার।
 
প্রায়ই আমরা বলি, বা লোককে বলতে শুনি নারী ও পুরুষ হলো পরস্পরের সমান। স্ত্রীকে বলা হয় স্বামীর বেটার হাফ বা অর্ধাঙ্গিনী। বলা হয়, নারী ও পুরুষ হলো একটি গাড়ীর দুই চাকা বিশেষ। একটি ছাড়া আরেকটি অচল। আসলে, নারী ও পুরুষ পরস্পরের অলঙ্কার স্বরূপ। একে অন্য ছাড়া অসম্পূর্ণ। একজন পুরুষ যতই বিত্তের মধ্যে বাস করুক না কেন, নারীর সহচর্য ছাড়া সে অসম্পূর্ণ। নারী ছাড়া সুখ কল্পনা করা অবাস্তব। আবার সৃষ্টিকর্তা বলেন, ‘আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়।’ শুনতে ভালো লাগে। আমার তো মনে হয় নারী পুরুষের সমান নয় বরং জীবনের প্রবাহে নারীর ভূমিকা পুরুষের থেকে অনেক অনেক বেশী। নারী কখনো মা, কখনো মেয়ে, কখনও বোন, কখনও প্রেমিকা, কখনো স্ত্রী। সব ভূমিকাতেই নারী অনন্য।
 
কিন্তু মুশকিল হলো আমরা অনেকেই নারীকে এই মর্যাদা দিই না। ছোটবেলায় নারীকে বাবার উপরে নির্ভর করতে হয়। বড় বেলায় স্বামীর উপর। শেষ বেলায় সন্তানের উপর। সারাজীবন অনেকেই দাসী হয়েই কাটিয়ে দেয়। কখনও স্বাধীন হয় না।
 
আজও পরিবারে মেয়েদের ব্যক্তি স্বাধীনতা নেই। বিয়ের মত একটা চিরস্থায়ী বন্ধনের ক্ষেত্রে তাকে পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয়। একটা ছেলে পছন্দ মতো দশ বিশটা মেয়ে দেখে বিয়ে করতে পারে কিন্তু নারী তা পারে না। এমনকি তাকে বিয়ের আগে তার হবু বরকে অনেকের দেখার সুযোগও ঘটে না। সে কি কালো কি ফর্সা, বেঁটে নাকি লম্বা, সুশ্রী নাকি বিশ্রী এ সিদ্ধান্ত পরিবার নিবে। আর পরিবার দেখে অর্থ,চাকরী, কোন প্রতিষ্ঠিত ছেলে। তাদের কাছে ভালো ছেলের থেকে ভালো চাকরীওয়ালা ছেলে বেশি প্রাধান্য পায়। কিন্তু নারীরা চাকরী বা বিত্তশালী ছেলের থেকে বরাবরই এমন ছেলে চায় যে তার কেয়ারিং করবে, তার মন বুঝবে, তাকে যথার্থ মূল্যায়ন করবে। এক প্রকার জোর করে তার ঘাড়ে বর নামক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পর তার পছন্দ হোক আর না হোক অনিচ্ছা সত্বেও তার সঙ্গে বাকিটা জীবন কাটাতে হয়। এটা এক প্রকার অত্যাচার।
 
বর্তমানে যার পুত্র সন্তান হয় সে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে। সমাজে মিষ্টি বিতরণ করে। লাখ টাকার স্বপ্ন দেখে। মেয়ের বাপ মানেই কাঠগড়ার আসামী। জন্মদায়িনী মাকে শুনতে হয় শশুর বাড়ির লাঞ্ছনা। জন্মের পর থেকে বাবাকে টাকা পয়সা জমাতে শুরু করতে হয়। প্রতিটি মূহুর্তে শুনতে হয় “মেয়ে হয়েছে টাকা জমাও নাহলে বিয়ে দিবে কি করে”। বিয়ের সময় দরদাম শুরু হয়। জিজ্ঞাসা করা হয় কত দিবে মেয়ের বাপ ? যুগের অনুপাতে চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। প্রশ্ন হল পুরুষের কেন দরদাম হয় না ? নারীর সাথে কেন এই দ্বিচারিতা ?ওহে পুরুষ! তুমি তোমার সুখের জন্য তাকে নিয়ে আসবে, তোমাকে কেন যৌতুক দিতে হবে ভাই ? উচিৎ ছিল তোমার তাকে মূল্যবান উপহার দিয়ে ঘরে নিয়ে আসা এবং তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা। কিন্তু উল্টো রাজার দেশে সবকিছু অনিয়মে চলে। ফলে অর্থের অভাবে সেই সমস্ত মা বাবা কে ভিক্ষা পর্যন্ত করতে হয়। পনপ্রথার মত সামাজিক ক্যানসার গোটা সমাজব্যবস্থাকে আজ কলুষিত করে তুলেছে।
 
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো অনুযায়ী প্রতিদিন প্রতি নব্বই মিনিটে একটি করে বধূকে পণের কারণে হত্যা করা হয়। সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, ভারতবর্ষে প্রতিদিন 2000 জন কন্যা সন্তানকে মাতৃ জঠরে হত্যা করা হয়। এইগুলো সরকারি হিসেব। এর বাইরে প্রতিদিন শতশত নারী ট্রেনে বাসে গৃহে কর্মক্ষেত্রে নিগৃহীত হচ্ছে, হিংসার শিকার হচ্ছে, যার কোন রেকর্ড নেই।
অন্যদিকে, প্রচলিত নিয়মে একজন পুরুষের কাজ উপার্জন করা, সেই উপার্জনের কারণে সারাদিন বাড়ীর বাইরে থাকেন। বাইরের কাজের ক্ষেত্রে তিনিই সিদ্ধান্ত নেন। সারাদিন বাড়ী সামলায় স্ত্রী। দশভূজা হয়ে সব কাজ সামলায়। রান্না বান্না, ঘর দোর পরিষ্কার রাখা, স্বামী, ছেলেমেয়েদের পোষাক আশাক ঠিক রাখা, তাঁদের কে পড়ানো, স্কুলে পাঠানো, স্বামীর জন্য টিফিন তৈরি থেকে বাড়ীর নিত্যকার হাজারো টুকিটাকি সমস্যা সমাধানে সিদ্ধহস্ত বাড়িতে থাকা স্ত্রীরা। নারীকে সব পরিশ্রমের মধ্যে রান্না-বান্না করে নিজে খেতে হয় সবাইকে খাওয়ানোর পরে। খাবার কিছু থাকল কি না কেউই দেখেন না। তার উপরে পরিবারের সবার মন জয় করে চলতে হয়।
 
নারীরা তাঁদের স্বামীকে ভালোবাসলে তাঁদের ‘পতিব্রতা স্ত্রী’ বলে সম্মানিত করা হয় আর পুরুষেরা তাঁদের স্ত্রীকে ভালোবাসলে ‘বউ পাগলা’ বলে ব্যঙ্গ করা হয়। কেন? নারী কি তার স্বামীর কাছে হতে ভালোবাসা পাওয়া অধিকার রাখে না ? পুরুষ মানেই বস আর নারী মানে দাসী? স্বামী স্ত্রী পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসবে এটা তাদের পরস্পরের অধিকার। আমাদের সমাজে তাই তো আজ পুরুষদের জন্য ‘জামাই-আদর’ আছে। কিন্তু নারীদের জন্য কোনো ‘বউ আদর’ নেই। হিন্দু সমাজে জামাই ষষ্ঠী আছে বউ ষষ্ঠী নেই। কি অবাক ব্যাপার!
 
এ রকমভাবে লেখতে গেলে মনে হয় এই তালিকা শেষ করা যাবে না। তবে, নারীদের নিয়ে আমাদের সবার চিন্তা-ধারণা কেমন হওয়া উচিত তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আমাদের সব মহান ব্যক্তিদের ধ্যানধারণায়। যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “যে স্বামী সকালে ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীকে কমপক্ষে পাঁচ মিনিট জড়িয়ে ধরে রাখে তাঁর কর্মক্ষেত্রে বিপদের আশঙ্কা থাকে কম। কবি নজরুল বলেছেন- “সেই পুরুষই কাপুরুষ যে স্ত্রীর কাছে প্রেমিক হতে পারেনি।”
সমরেশ মজুমদার বলেন – “স্ত্রীকে সপ্তাহে একদিন ফুচকা খাওয়াতে এবং মাসে একদিন ঘুরতে নিয়ে গেলে স্বামীর শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকে।”
“মেয়েদের মনে ভালোবাসা ও অভিমান দুটোই থাকে বেশি। তাই অভিমানটাকে ভালোবাসার চেয়ে বড় করে দেখা যাবে না। তাই স্বামীদের উচিত স্ত্রীর সব অভিমান ভালোবেসে ভাঙানো!”
– ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। “যুদ্ধে বিজয়ী হলেই বিপ্লবী হওয়া যায় না৷ প্রকৃত বিপ্লবী তো সেই যে স্ত্রীর মনের একমাত্র বীরপুরুষ।” – চে গুয়েভারা
“একটা শিশুকে দুনিয়ার মুখ দেখাতে মা যে কষ্ট সহ্য করে তা বাবা সারা জীবন ভালোবেসেও শোধ করতে পারে না। তাই প্রত্যেকটা স্বামীর উচিত তাঁর সন্তানের মাকে কোনোরকম কষ্ট না দেওয়া।”-জীবনানন্দ দাশ। “স্ত্রীর সঙ্গে হাসি ঠাট্টা মজা করা স্বামীর কর্তব্য।তুমি যে মানের পোষাক,খাবার খাবে সে মানের পোষাক খাবার স্ত্রীকেও পড়াবে, খাওয়াবে।তাকে কখনো মন্দ কথা বলব না। সেই পুরুষ সবথেকে উত্তম পুরুষ যে তার স্ত্রীর কাছে ভালো।”- মোহাম্মদ (সঃ)।
এই সমস্ত মহান মনীষীদের বানী থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, নারীরা কত দামী বস্তু। সুখ শান্তিতে আনয়নে তাদের অবদান অনেক বেশি।
এত কিছু জানার পরও আমরা নারীদের যথেষ্ট সম্মান দিতে নারাজ। আমাদের সমাজের বিচারে এত অযোগ্য নারীরাও কিন্তু ঘুমিয়ে না ঘুমিয়ে, খেয়ে না খেয়ে ১৮-২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন তাঁদের দুটি নরম কোমল হাতে। সেই নারীরা এত অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরও নিজের শরীর ও চেহারার যত্ন নিতে পারেন নিখুঁতভাবে এবং রাত্রিতে ঠিকই পুরুষকে নিজের রুপের মাধুর্য দিয়ে মনোরঞ্জন করেন।  মনের সব কষ্ট, যন্ত্রণা ও একাকিত্বের প্রকাশ করেন নীরবে নিভৃতে চোখের জলে। কারণ নারীরা শান্তিকামী। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাদেরকেই আজ সবথেকে বেশি অবহেলা করা হয়।
 
নারী শুধুমাত্র আমাদের জন্মই দেন না। আমাদের গড়ে তোলেন। নারীর একটি অন্যতম রূপ হলো, মা। একজন মা’ই শুধুমাত্র জানে, একটি সন্তানকে দশ মাস গর্ভে বহন করা কি হারকিউলিয়ান কাজ! প্রত্যেকদিন প্রত্যেক মুহূর্তে অস্বস্তি অনুভব করা, কখনও পিঠের, কখনও কোমরের, কখনও ঘাড়ের, কখনও পেটের যন্ত্রনা ভোগ করা মায়ের অনিবার্য কর্তব্য। তারপর রয়েছে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে তাকে নিরন্তর যত্ন, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখা। একদিন দুদিন নয়, দিনের পর দিন! তারপরে যখন কথা বলতে শিখলো সন্তান, তখন শুরু হলো, আর এক যুদ্ধ! ওকে শিক্ষিত করতে হবে। প্রকৃত মানুষ করতে হবে। প্রাথমিক পাঠ কে দেবে? মা দেবে। যতই শিক্ষক দেওয়া হোক না কেন মা’ই প্রকৃত শিক্ষক! পৃথিবীর সবথেকে বড় শিক্ষক। তিনিই আমাদের সব থেকে বড় নির্মাতা। তিনিই তিলে তিলে গড়ে তোলেন দেশের ভবিষ্যৎ জন নায়ক, সফল আমলা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিচারক, উকিল, সু নাগরিক। বাবার অবদান থাকলেও মায়ের ভূমিকা সর্বাধিক। কিন্তু মায়েরা সেই সম্মান পান না। তাঁরা অর্ধাঙ্গিনী হয়েও অর্ধেক সম্মান পান না। আমরা উপার্জনশীল পুরুষরা প্রায়ই বলি, ‘সারাদিন বাড়ীতে বসে থাকো তো, বুঝতে পারো না কিভাবে টাকাটা আসে। সারাদিন বাড়ীতে বসে করোটা কি শুনি? এই তুমি চুপ করে থাকো!’ তাঁরাও চুপ থাকেন। ভাবেন, সত্যিই তাঁরা উপার্জন করেন না, তাঁদের মতামতের কি দাম আছে?
 
একটি দেশ নারীকে কতটা গুরুত্ব দেয় বা নারীর প্রতি কি ব্যবহার করে তা দেখেই বোঝা যায় ওই দেশ কতটা উন্নতি লাভ করেছে। দেশ যদি তার মেয়েদের প্রকৃত শিক্ষিত করার দায়িত্ব নেয়, মেয়েদের সব ক্ষেত্রেই সমানিধিকার দেয়, তাহলেই সেই দেশ এগিয়ে যায়। কিন্তু যদি দেশে মেয়েদের অশিক্ষিত রাখা হয়, তাদের দমিয়ে রাখা হয়, তাদেরকে সব ধরনের সুরক্ষা ও অধিকার না দেওয়া হয় সেই দেশ এগোয় না, পিছিয়ে যায়।
 
বহু বছর পূর্বে নেপলিয়নের বলা কথাটিকেই যদি ধরি, ‘তোমরা আমাকে ভালো মা দাও, আমি তোমাদের সুন্দর জাতি উপহার দেবো।’ ভালো মা কে? প্রকৃত শিক্ষিত মা’ই একজন ভালো মা। আবার দার্শনিক ব্রিঘম ইয়ং বলেন, ‘তুমি একজন পুরুষকে শিক্ষিত করলে, তুমি একজন পুরুষকেই শিক্ষিত করবে। কিন্তু যদি একজন মেয়েকে শিক্ষিত করো তাহলে তুমি একটি প্রজন্মকে শিক্ষিত করলে।’ তাহলে, ভালো দেশ, ভালো সমাজ, ভালো প্রজন্ম বানাতে গেলে আমাদের সর্বাগ্রে ভালো শিক্ষিত মা বানাতে হবে। দেশের মেয়েদের প্রকৃত শিক্ষিত করতে হবে। কিন্তু মুশকিল টা এখানেই। একটা ছেলে M.A অথবা B.A পাশ করে ত্রিরিশ বছর পর্যন্ত চাকরীর জন্য অপেক্ষা করতে পারে এই আশায় যে, সে তার স্বপ্ন পূরন করবে নিজের পায়ে দাড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু আমাদের সমাজে মেয়েদের নাকি উচ্চ ডিগ্রি করতে নেই, বলা হয়ে থাকে – ওরা চাকরী করে কি করবে ? সেই তো রান্নাবান্না, বাড়ির কাজই করবে। কোনরকম মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলেই হল। যাতে করে পাত্র পক্ষকে বলা যায় আমার মেয়ে শিক্ষিত। বিয়ের পর ছেলেমেয়েকে পড়াতে পারবে। ষোলো বছর পেরোতে না পেরোতেই পাশের বাড়ির কাকি খোঁচা দিয়ে বলে ওঠে ‘মেয়ের কি বুড়ি হয়ে বিয়ে দিবে ? বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে দিনকাল ভালো নয় আপদ দূর করলেই শান্তি পাবে।’ ব্যস শুরু হল পাত্র দেখা। কয়দিন পর একটা রাজমিস্ত্রী বা কন্ট্রাক্টর দেখে বিয়ে দেওয়া হল। মেয়েটির স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে সে মাষ্টার, ডাক্তার, বা ইন্জিনিয়ার হবে। কিন্তু সমাজের এই যঘন্য নীতি তার এই স্বপ্নপূরনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো।
 
এটা প্রমাণিত, মেয়েরা পুরুষদের থেকে কোন দিক থেকেই কম নয়। ওদেরকে পুরুষদের সমকক্ষ না ভাবা পুরুষতান্ত্রিক কতৃত্ব ও মনোভাব থেকে এসেছে। ওরা শারিরীক ভাবে পুরুষদের তুলনায় কম শক্তিশালী মানেই মানসিক দিক দিয়ে কম শক্তিশালী নয়। মেয়েরা পুরুষদের সাথে সমানতালে দেশকে রাজনৈতিক ভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে, সফলভাবে দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মেয়েরা আই এ এস, আই পি এস, আই এফ এস হয়ে দক্ষতার সাথে দেশের সেবা করছে। দেশের সব রকম পেশায় অংশগ্রহণ করে সব ক্ষেত্রেই পুরুষ সহকর্মীদের টেক্কা দিচ্ছে। চিকিৎসা, আইন বিভাগ, তথ্য ও প্রযুক্তি, কূটনীতি, অভিনয়, সিনেমা পরিচালনা, বড়বড় কর্পোরেট সংস্থা পরিচালনা, খেলা ধূলার অঙ্গনে, এমন কি সীমান্ত বাহিনী থেকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও মেয়েরা তাদের প্রতিভা, দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু দক্ষতার প্রমান দেওয়া সত্ত্বেও চাকরি ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় এখনো অনেক কম। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আজও মহিলাদের সমান অধিকার দেওয়া গেল না। চাকরি বাকরির ক্ষেত্রে মেয়েদের সংখ্যা এখনও কম। শহর এলাকায় মেয়েদের অবস্থা তুলনামূলক ভাবে অনেক ভালো। কারণ শিক্ষিত মেয়েরা কিছু না কিছু কাজ করে যখন উপার্জনক্ষম হয়, তাঁরা অনেকটা ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে বাঁচেন।
 
কিন্তু দেশের বিশাল অংশ গ্রাম এলাকায় মেয়েদের প্রকৃত শিক্ষা হয় না। উচ্চ শিক্ষার সুযোগ আজও ভালো নেই। যাঁরা উচ্চ শিক্ষিত বা শিক্ষিত তাঁরাও উপার্জন করার মতো কাজ গ্রাম এলাকায় খুঁজে পান না। যেটুকু পান সেটা খুব নগন্য। যতদিন মেয়েরা না শিক্ষিত হচ্ছে, অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে ততক্ষণ মেয়েদের প্রকৃত উন্নতি হওয়া মুশকিল। বহু স্ত্রী স্বামীর অন্যায় অত্যাচার মুখ বুঁজে সহ্য করে জীবন অতিবাহিত করে দেন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকার কারণে। কারণ স্বামীর ঘরে লাথি ঝাঁটা জুটলেও তিনবেলা খাবার, আশ্রয়টা তো জোটে। ভাই দাদাদের পরিবারে গলগ্রহ হয়ে থাকতে হয় না। আর মেয়েরা কিছুটা উপার্জন করতে পারলে সংসারের শ্রীবৃদ্ধি হয়। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ভাবে সংসারে তারও অর্থনৈতিক অবদান রয়েছে। সংসারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস তৈরী হয়। আবার মেয়েরা শিক্ষিত হলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে মনের মধ্যে সেন্স অব বিউটি তৈরী হয়। ঘরবাড়ী সুন্দর করে সাজাতে শেখে। বাবা মাকে ক্রাইসিস এর সময় সাহায্য করতে শেখে। শ্বশুর বাড়ীতে সকল সম্পর্কের মানুষকে পরিণত বুদ্ধি দিয়ে সামলাতে পারে। অর্জিত শিক্ষা দিয়ে সংসারের যাবতীয় সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার সাহস অর্জন করে। পরিবারকে বদলায়। প্রতিবেশীদের বদলে দেয়। এই ভাবেই প্রজন্ম থেকে সমাজ বদলায়।
 
শেষ অবধি, আমরা আশা করি, আমাদের নারীর প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা হচ্ছে বো সমানুধিকার দেবো। নতুন কর্মক্ষেত্র শিকারী করা হবে। মায়ের পদতলে স্বর্গ, বিশ্বাসী মায়ের সেবা করবো, ক্যানারের বিষয়ে আলোচনা হোক না কেন, কণার মাকাকে সম্মান দেওব, এবং কণাসন্তানকে পেয়েছি সমান দিকটি, বিয়ারের জন্য নয় সুকানা বানাতে পার্সেন্ট সব ধরণের পর্যবেক্ষণ করা, এই বিশ্বাস রাখুন।